শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক, সমাজ বিশ্নেষক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আহমদ শরীফ চেয়ার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে মুক্তিসংগ্রাম, কালের যাত্রার ধ্বনি, নৈতিক চেতনা :ধর্ম ও মতাদর্শ, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪৪ সালে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবছর পার করেছে। আপনার কাছে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট জানতে চাই।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিষয়টি জানতে হলে ব্রিটিশদের 'ভাগ কর, শাসন কর' নীতির দিকে আমাদের তাকাতে হবে, যার মাধ্যমে এখানকার প্রধান দুই সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে ওরা ফায়দা তুলত। ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভাগ করার সময়ও তারা একই নীতি প্রয়োগ করে। তখন প্রধানত কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু সম্প্রদায় ওই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করে। তখন ঢাকার নবাব পরিবার ছিল বাংলার মুসলমানদের অভিভাবক। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড কার্জন বাংলা ভাগের পক্ষে মুসলমানদের সমর্থন আদায়ের জন্য ঢাকায় আসেন; নবাববাড়িতে খানাপিনাও করেন। তিনি এমন একটা ধারণা প্রচার করেন- বাংলা ভাগ করা হয়েছে মুসলমানদের সুবিধার জন্য। নবাব সলিমুল্লাহ কার্জনের কাছে স্বল্প সুদে বড় একটা লোনের আবেদন করেন; তাঁকে তা দেওয়াও হয়। বলা যায়, ব্রিটিশ ইন্ধনেই সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন করেন এবং বঙ্গভঙ্গের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। তবে কংগ্রেস ও হিন্দু সমাজের জোরদার আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হয়। তখন নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব আবদুল লতিফ, তখনকার তরুণ নেতা এ কে ফজলুল হক প্রমুখ পূর্ববঙ্গে একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এ কারণে বলা হয়, ওই বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২১ সালে এর প্রতিষ্ঠা হয়। ওই বছরেরই ১ জুলাই ঘোষণা দিয়ে ক্লাস শুরু হয়।
সমকাল: গত ১শ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বলতম দিকগুলো সম্পর্কে বলুন।
ফজলুল হক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাতে ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারে, ব্রিটিশ সরকার তা নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্ব দেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে। এখানে শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত আইন-কানুন প্রণয়ন ইত্যাদি তাঁর নেতৃত্বেই হয়। এ বিষয়ে যে কমিটিগুলো হয়, সেগুলোরও প্রধান ছিলেন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার পি জে হারটগ উপাচার্যের দায়িত্ব নেন। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন; বিদ্যানুরাগী ছিলেন। প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোভাবে চালানোর জন্য। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে পেছনে পড়ে না থাকে, তার জন্য এখানকার উপাচার্য ও শিক্ষকদের মধ্যে একটা প্রাণপণ প্রচেষ্টা ছিল। কর্তৃপক্ষের আরেকটা চেষ্টা ছিল, যাতে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া যায়। কারণ ওই দুই পর্যায় পার হয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের প্রায় সবাই এসেছিলেন কলকাতা থেকে এবং বেশিরভাগ ছিলেন হিন্দু। সবার মধ্যে একটা বোধ ছিল- আমরা কলকাতা ছেড়ে এ পশ্চাৎপদ এলাকায় এসেছি; একে ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, এশিয়ায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তখন অত্যন্ত অগ্রসর ছিল। জাপান ও চীন শুরু করেছে কলকাতার পরে, যদিও তারা দ্রুত এগিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ১৯২১-১৯৪৭ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুব ভালো মানের একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগসহ আরও কিছু কারণে এখানকার হিন্দু শিক্ষকদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটু দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপরও আমি বলব, ১৯৭১ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভালোভাবেই চলেছে। বিশ্বের যে কোনো জায়গায় এখান থেকে নেওয়া ডিগ্রির একটা সম্মান ছিল; গুরুত্ব দেওয়া হতো।
সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের অবনমন তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু হয়?
ফজলুল হক: সত্য কথা বলতে কি, বঙ্গবন্ধু তাঁর ক্ষমতা সংহত করতে পারেননি; রাষ্ট্রের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি। মন্ত্রিসভার ভেতরের বিরোধ, সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ, দলের মধ্যে বিরোধ তীব্র ছিল। দেখা গেছে, তাঁর দল সর্বতোভাবে রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপব্যবহার ও এক ধরনের ভোগ করেছে। এই যে মোহাম্মদপুর এলাকা; সেখানকার বাড়িগুলো নির্মিত হয়েছিল ভারত থেকে আসা মোহাজেরদের জন্য। স্বাধীনতার পর এগুলোর অনেকটিই দখল হয়ে গেল। এগুলোর ছাপ পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে এমন লোকও উপাচার্য হয়েছেন, যিনি যুদ্ধের পুরো সময়টা ছিলেন ইয়াহিয়ার বিজ্ঞান উপদেষ্টা; কথা বলতেন ইংরেজিতে; যাঁর মধ্যে বাঙালিত্বের লেশমাত্রও ছিল না। অথচ যুদ্ধের পর তাঁকে ইসলামাবাদ থেকে উড়িয়ে এনে উপাচার্য বানিয়ে দেওয়া হলো। শিক্ষকদের মধ্যে দলীয় রং ধারণের বিষয়টি তখন থেকেই শুরু হয়। তখন শিক্ষকদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হওয়ার যে হিড়িক পড়ল, তার লক্ষ্য ছিল স্রেফ ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ; বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা নয়। বাকশাল যখন হলো, আমরা ৬-৭ জন বাদে সব শিক্ষককে এতে যোগ দিতে হয়। যে প্রক্রিয়ায় সরকার সমর্থক শিক্ষক ও ছাত্রনেতারা এ শিক্ষকদের স্বাক্ষর নেন, তা শোভন ছিল না।
সমকাল: সামরিক শাসকরাও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিনষ্ট করতে চেয়েছেন।
ফজলুল হক: সামরিক শাসক জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনে এমন কিছু পরিবর্তন আনেন, যা প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থের বিরোধী ছিল। এরশাদও একই চেষ্টা করেছিলেন; প্রতিরোধের মুখে পারেননি। জিয়ার তৈরি আইন সে সময় প্রতিরোধ করা না গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব নিয়মে সেগুলোকে এড়িয়ে স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে। সরকারগুলোর ধারণা ছিল- বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ক্ষমতায় বসাতে পারে, আবার ক্ষমতা থেকে তাড়াতেও পারে। তাই সব সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা সময় পর্যন্ত তা প্রতিরোধ করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত আর ধরে রাখতে পারেনি।
সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের স্বায়ত্তশাসনের অবক্ষয় কি উপাচার্যদের অবক্ষয় দিয়েই শুরু?
ফজলুল হক: আমাদের বক্তব্য ছিল, স্বায়ত্তশাসন মানে আমি আওয়ামী লীগ করব, বিএনপি করব বা জামায়াত করব- তা নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে কোনো দল বা ব্যক্তির লেজুড়বৃত্তির স্বাধীনতা নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে একাডেমিক কার্যক্রমে স্বাধীনতা ভোগ করা; স্বাধীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা। কিন্তু শিক্ষকরা বিভিন্ন দলভুক্ত হওয়া শুরু করলেন। এর ফলে দেখা গেল, এমন লোক উপাচার্য হলেন, যিনি একাডেমিক দিক থেকে বা গবেষক হিসেবে খ্যাতিমান হলেও উপাচার্যের চেয়ারে বসার পর একেবারে বশংবদ হয়ে পড়লেন।
সমকাল: উপাচার্য ফজলুল হালিম চৌধুরী সম্পর্কে অনেক মিথ চালু আছে। আপনার মূল্যায়ন কী?
ফজলুল হক: উনি খুব ধীর-স্থির মানুষ ছিলেন। কোনো বিতর্কিত বিষয় তাঁর কাছে গেলে তিনি তা রেখে দিতেন; চট করে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতেন না। বারবার পড়ে কী সমাধান বের করা যায়, সে চিন্তা করতেন। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হোক- তিনি তা চাইতেন না। তবে এত দেরি করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনেকেরই ক্ষোভ ছিল। তিনি প্রথমে নীল দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন; সে দলের সব কথা তিনি মানতেন না। তিনি বলতেন, আমি সবার উপাচার্য। আমি একটা দল থেকে নির্বাচিত হয়ে আসছি; কিন্তু আমাকে কাজ করতে হবে সব ছাত্র-শিক্ষকের কল্যাণে; আইনসংগত ও ন্যায়সংগতভাবে। আপনারা আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন না। তবে তিনি দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ৩৫-৪০ জনের একটা গোষ্ঠী ছিল; তাদের সমর্থনে। এসব কারণে নীল দল তাঁকে খুব অপছন্দ করত। আমি মনে করি, ফজলুল হালিম চৌধুরী বাস্তবসম্মতভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে চেষ্টা করেছেন। তবে ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের দলাদলি এত প্রকট ছিল, তা সামলানো তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল।
সমকাল: বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় শিক্ষার পরিবেশ যেমন উন্নত ছিল; তেমনি সহশিক্ষা কার্যক্রমও ছিল ব্যাপক। এখন তা প্রায় শূন্য কেন?
ফজলুল হক: এর একটা কারণ হলো, এনজিও বা সিভিল সোসাইটি সংগঠনের সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যাপক অংশকে যুক্ত করে ফেলা। সেখানে তারা কিছু টাকা পায় এবং এক ধরনের কাজ করে, আমাদের দৃষ্টিতে যেগুলো জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয় বরং এক ধরনের ক্ষতিকর বলা যায়। আরেকটা বিষয় হলো, এখন কোনো সরকারই চায় না, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসুক। একটা শিক্ষার্থীকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তও যদি ঠিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন হবে; ন্যায়-অন্যায় বোধ তৈরি হবে। অনেক কিছুই সে মানতে চাইবে না তখন। শিক্ষার্থীর এমন আচরণ কে চায়! জ্ঞান মানে যে শক্তি- তা সাধারণের মধ্যে দেওয়া হবে না। সাধারণকে বলা হবে- লেখাপড়া করো, ডিগ্রি নাও, চাকরিবাকরি করো; ব্যস। এদিক থেকে বলা যায়, সমস্যাটার মূল রাজনৈতিক। রাজনৈতিক কারণগুলোর পরিবর্তন না করা গেলে অল্পস্বল্প পরিবর্তন হয়তো হবে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কোন সরকার এ পরিবর্তন আনবে? আওয়ামী লীগ করতে পারত; কিন্তু তারা তা করতে চায় না। ফলে শিক্ষাঙ্গন ভালো নেই। পাঠ্যসূচি, শিক্ষাক্রম- এগুলো হলো প্রাণশক্তি শিক্ষাব্যবস্থার; এ পাঠ্যসূচি-শিক্ষাক্রম প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যেভাবে করা হয়েছে, যা উচ্চ শিক্ষার ভিত্তি, তা আমি যতটুকু জানি, ভালো নয়।
সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় বাম রাজনীতির বেশ প্রভাব ছিল; এখন তা নেই বললেই চলে-
ফজলুল হক: এর কারণ হলো, আমাদের দেশে যাঁরা এ পর্যন্ত বাম রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের নিদারুণ ব্যর্থতা। তাঁরা কেউ মস্কোতে যা ঘটেছে হুবহু তা অনুসরণ করেছেন। কেউ পিকিংয়ে যা হয়েছে তার কার্বন কপি চালাতে চেয়েছেন। মার্কসবাদকে মুক্তমন নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেননি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে '৭০-এর দশক পর্যন্ত আমাদের জনগণ সাড়া দিত। তারা জাগ্রত ছিল। তার মানে, তার শুভ বোধগুলো সক্রিয় ছিল। কিন্তু এরশাদের সময় থেকেই মানুষ জাগ্রত নয়; ঘুমন্ত। মানুষ ন্যায় চায়, তবে অন্যায়ের প্রাধান্য দেখে দেখে হতাশ হয়ে দূরে চলে যায়। বাম দলগুলো যে পদ্ধতিতে কাজ করতে চায়, তা বাস্তবসম্মত নয়।
সমকাল: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে কী বলবেন?
ফজলুল হক:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন প্রতিবছর শ-দেড়েক শিক্ষার্থী এমফিল ডিগ্রি নেয়। এগুলোকে গবেষণা বলা হয়। যাঁরা পিএইচডি করেন, তাঁদের কাজকেও গবেষণা বলা হয়। এমন হলে তো বলা যায় সেখানে অনেক গবেষণা হয়। কিন্তু এগুলো চাকরিতে উন্নতি ঘটালেও প্রকৃত গবেষণা নয়। এগুলোতে গবেষকের মন একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীর চোখের সামনে তার পরীক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কের চেহারা থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিস্টরি অব বেঙ্গলের দু'খণ্ড বের করেছে। দ্বিতীয়টা বের হয়েছে যদুনাথ সরকারের সম্পাদনায়; প্রথমটা আরও কয়েক বছর আগে বের হয়েছে রমেশচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায়। এগুলো খুব গৌরবজনক বই হিসেবে স্বীকৃত ছিল। শুধু ভারতে নয়; বাইরের জগতেও। তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড বের করার পরিকল্পনা ছিল। এর জন্য টাকাও বরাদ্দ ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। গবেষক থাকলে নিশ্চয় উদ্যোগও থাকত। আসলে আগ্রহই তো নেই কারও।
সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আগের গৌরব ফিরিয়ে আনতে কী করতে পারে বলে মনে করেন?
ফজলুল হক: আগে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কটা যেমন ছিল, এখন তেমন নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পাঁচ বছর পর অনেকে তার সব শিক্ষকের নাম বলতে পারবে না। মূল বিষয় হলো, শিক্ষকের সেই বৈশিষ্ট্য নেই; নতুন কোনো বৈশিষ্ট্যও গড়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সমাজে বুদ্ধিজীবী বলে পরিচয় পেতেন। বুদ্ধিজীবী শব্দটা ভালোই ছিল। এখন বুদ্ধিজীবীরা বিশিষ্ট নাগরিক বলে পরিচিত হতে আগ্রহী। তাঁরা এডুকেশন ওয়াচ, ডেমোক্রেসি ওয়াচ, পার্লামেন্ট ওয়াচ ইত্যাদি সংগঠনে ভিড়ে গেছেন। সেখান থেকে তাঁরা বেশি টাকা আয় করেন। এগুলোর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষকদের কমিটমেন্টে ঘাটতি আছে। এটা সত্য, ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় আমাদের পাঠ্যসূচি-শিক্ষাক্রম পিছিয়ে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা হলো, এ সম্পর্কিত বোধ। অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে হবে। যে পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাক্রম নিয়ে চলছি, তা ইনঅ্যাডেকুয়েট হয়ে পড়েছে। একে অ্যাডেকুয়েট করতে হবে। এ বোধটাই তো নেই। এখানে অনেক কিছু বাইরের বিষয় আছে, যার কারণে ভেতরের সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়।
সমকাল: ধন্যবাদ।
ফজলুল হক: আপনাদেরও ধন্যবাদ।