গ ত ১৮ জুন নড়াইলে একটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় যখন জুতার মালা পরানো হয়; জানা যায়, সে সময় কলেজ ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার। সেখানে ছিল দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য। তাদের সামনেই কলেজের তিনজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ক্যাম্পাসে থাকার সময়েই হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে দেয় সে কলেজের কিছু ছাত্র আর স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি। অধ্যক্ষের গলায় যখন জুতার মালা ঝোলানো হচ্ছিল, তখন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু একজন শিক্ষককে কুৎসিতভাবে হেনস্তা করার সেই ঘৃণ্য কাজে বাধা দেয়নি কেউ। এর ক'দিন পরই সাভারের আশুলিয়ায় এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণির এক ছাত্র ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে। বেধড়ক আঘাতে গুরুতর আহত হন শিক্ষক উৎপল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই দিন পর মারা যান তিনি। জানা গেছে, ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উৎপল সরকার ক'দিন আগে সেই ছাত্রকে একজন ছাত্রীর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে নিষেধ করেছিলেন। এ কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে সেই ছাত্রীর সামনে 'হিরোইজম' দেখাতে শিক্ষকের ওপর হামলা করে ছাত্রটি।

কয়েক দিনের ব্যবধানে শিক্ষক লাঞ্ছনা এবং শিক্ষক হত্যার এ দুটি ঘটনার পর সচেতন নাগরিকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু এই প্রতিবাদ তো করছেন অল্পসংখ্যক সচেতন নাগরিক। শিক্ষকদের হেনস্তা এবং হত্যা করা যে সমাজের মাথা হেঁট হয়ে যাওয়াই নির্দেশ করে; তৈরি করে সমাজের জন্য তীব্র এক গ্লানি- তা অনুধাবনের বোধ এবং সচেতনতা কি আমাদের বর্তমান সমাজে বহু মানুষের মধ্যে আছে? এখানে শিক্ষকদের অপমান আর নিগ্রহের ঘটনা তো নতুন নয়। কয়েক মাস আগেই বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে জেলে যেতে হয়েছিল। কয়েক বছর আগে নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করিয়েছিলেন একজন সংসদ সদস্য। সেই ঘটনাগুলোর পরও সমাজের সচেতন মানুষ প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদে কি প্রভাবিত হয়েছিল দেশের বহু মানুষ? শিক্ষকদের মর্যাদা এই সমাজে অনেক মানুষ অনুধাবন করতে পারছে না। এমন অশুভ আর বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখে রাষ্ট্র কি উদ্বিগ্ন? মানুষকে আলোকিত করার কাজে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের অপমান, আঘাত করা যখন সহজ হয়ে যায়; তাঁদের অমর্যাদা করা হয়ে পড়ে মামুলি ব্যাপার, তখন স্পষ্ট হয়- জ্ঞানের আলো আর মননশীলতা সেই সমাজে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে ক্ষমতার কদর্য দাপট দেখানোর রুচিহীন প্রবণতা।

শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত এক মানববন্ধনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেছেন, শিক্ষক উৎপলের মৃত্যু বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য লজ্জা ও অপমানের। কিন্তু ক্ষমতার প্রতাপ দেখানোর প্রতি লোভ আর নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ক্ষমতাধরদের তুষ্ট করে চলার প্রবণতা যে সমাজে বিলীন হওয়ার পরিবর্তে বাড়তে থাকে; সেই সমাজে নির্লোভ আচরণ, চিন্তাশীলতা, রুচিস্নিগ্ধতা, সামাজিক সচেতনতা অর্জনের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ থাকে না। এই প্রয়োজনীয় দিকগুলো অবহেলিত হলে সংখ্যা বাড়ে অনুভূতিহীন মানুষের। আর যে মন অনুভূতিশীল নয়, সেই মন অন্যায় দেখলে 'লজ্জা' অনুভব করবে, তা আশা করা যায় না। লজ্জা থাকার জন্য যে অনুভূতিশীল মনের প্রয়োজন, তেমন মন তৈরি করার চেষ্টা আমাদের সমাজে অনেক দিন ধরেই অবহেলিত এবং এ অবহেলা দিন দিন বাড়ছে।

ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে- এমন কথা ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা; সংখ্যালঘু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত যান পুড়িয়ে দেওয়া; পুলিশের উপস্থিতিতেই অবলীলায় কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা ঝোলানো; শাসন করা হয়েছে বলে শিক্ষককে নির্মমভাবে আঘাত করার ঘটনা নির্দেশ করে- এই সমাজে কমবয়সীদের মনে অশুভ চিন্তার অন্ধকার এখন কত গভীর! মানুষের মনে বোধহীনতা আর উগ্রতার অন্ধকার কেন বাড়ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে এখন প্রায়ই কথা বলা হচ্ছে আমাদের সমাজে। কিন্তু মানুষের মনের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের কতটা আন্তরিকতা দেখছি আমরা? যে রাজনৈতিক আচরণ আর সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের মনে সুবিবেচনা তৈরি করে; রুচিস্নিগ্ধতা আর প্রকৃত অর্থে সুন্দর জীবন কী, তা বুঝতে সাহায্য করে; সেই আচরণ আর চর্চা আমাদের সমাজে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এমন সামাজিক পরিস্থিতিতে অবিচক্ষণ আর বোধশূন্য মানুষের সংখ্যাই বাড়বে। সমাজে ধর্মান্ধতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার কদর্য দাপট দেখানোর প্রবণতা তাই টিকে থাকছে। দেশে অবকাঠামোগত আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে- এমন চিন্তায় তাই উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে আমাদের? মানুষের মনে শুভবোধ না থাকলে প্রযুক্তি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার সমাজকে শান্তিময় আর নিরাপদ করতে পারে না। 
শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে যে ছাত্র আঘাত করেছিল; জানা গেছে, সে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করত। কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের কথা শোনা যাচ্ছে। কোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে ইদানীং এত কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে? বহু কমবয়সী এখন মাদকাসক্ত। তারা যৌন হয়রানির মতো অপরাধ করছে অহরহ; করছে উগ্র ও দুর্বিনীত আচরণ। আগে পরিবারে কমবয়সীদের ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানোর যে চেষ্টা ছিল; মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনলাইনে হালকা আর চটুল বিনোদনে মগ্ন হয়ে থাকার এই সময়ে সেই চেষ্টা কতটা কার্যকর হচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি অনেক টেলিভিশন নাটক আর ওয়েব সিরিজেও সহিংসতা দেখানো হচ্ছে আকর্ষণীয়ভাবে। থাকছে অগভীর আর চটুল সংলাপ। অথচ দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক আর সমকালীন সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নাটক, ওয়েব সিরিজে চরিত্রগুলোকে কথা বলতে দেখা যায় না। ব্যবসায়িক লাভের জন্য বিনোদনধর্মী গণমাধ্যম উপাদানের ব্যাপক প্রচার আমরা দেখছি। কিন্তু দর্শকের মনে চিন্তাশীলতা, ইতিহাস-জ্ঞান আর সুরুচি তৈরি করতে পারে এমন নাটক, ওয়েব সিরিজ সচেতনভাবে নির্মাণ এবং প্রচারের উদ্যোগ নেই। বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রভাবশালী অবস্থান প্রাপ্তির প্রতি তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ এখন প্রবল। কিন্তু নিজের অধীত বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা এবং সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন পাঠের প্রতি আগ্রহ কমছে দিন দিন।

ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী অবস্থান অর্জন এবং হালকা বিনোদনে বুঁদ থাকার প্রতিই যখন বহু মানুষের প্রবল ঝোঁক দেখা যায়, তখন বিদ্যমান সামাজিক পরিবেশ মানুষের মন কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। জ্ঞানচর্চা যদি সমাজে মূল্যহীন হয়; শুভত্ব আর বিবেচনাবোধ সেই সমাজে থাকে না। শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা আর অবলীলায় তাঁদের হেনস্তার পুনরাবৃত্তি এই সমাজে মানুষের মনের অন্ধকার আর লজ্জাহীনতাই স্পষ্ট করছে। বিবেচনাবোধশূন্য মানুষ লজ্জা অনুভব করে না। তাই তারা কুৎসিত আচরণ করতে পারে অবলীলায়। মনের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য আন্তরিক উদ্যোগ এখনই না নিলে যে বিপদ আর অন্ধকার সমাজে গাঢ় হচ্ছে, তা দূর করা হয়ে পড়বে আরও কঠিন।

ড. নাদির জুনাইদ: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়