আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি। বর্তমান এমপি নূর মোহাম্মদ ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিনের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রায়ই তাঁরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘাতে জড়াচ্ছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নিয়ে দু'পক্ষের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। কিছুদিন পরপর উত্তেজনায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা চেষ্টা করেও এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ পাচ্ছেন না। তাঁরা কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নূর মোহাম্মদ কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া) আসন থেকে নৌকার টিকিটে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি পুলিশের সাবেক আইজি। তাঁর বাড়ি কটিয়াদী। অন্যদিকে সোহরাব উদ্দিন পাকুন্দিয়ার বাসিন্দা। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনের এমপি ছিলেন। তবে নূর মোহাম্মদ রাজনীতিতে আসার পর তাঁর দলীয় মনোনয়ন ও স্থানীয় রাজনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। এরই মধ্যে কেন্দ্র ও জেলা নেতাদের উপেক্ষা করে নূর মোহাম্মদ ২০২০ সালের মে মাসে উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাধিক ইউনিয়ন কমিটি করলে প্রতিরোধে নামেন সোহরাব। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্র থেকে এক ঘোষণায় নূর মোহাম্মদের করা সব কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপরই পাকুন্দিয়া আওয়ামী লীগে সোহরাব পক্ষের পালে গতি পায়। ১০ মাস পর গত বছরের ২২ জুলাই সোহরাবকে আহ্বায়ক করে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করা হয়। এবার বর্তমান এমপির কর্মী-সমর্থকরা আহ্বায়ক পদ থেকে তাঁকে সরাতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। তবে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ৬৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয় জেলা। ওই কমিটি হওয়ার পর দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা প্রতিটি দলীয় ও জাতীয় কর্মসূচি আলাদা পালন করে আসছেন। এভাবে গত ১১ মাসে কর্মসূচি পালনে কমপক্ষে ১৫ বার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের জেরে চরফরাদি ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. আবদুল্লাহকে মেরে জখম করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক নাজমুল হোসেন। এই হামলার মধ্য দিয়ে নূর মোহাম্মদ ও সোহরাবের অনুসারীদের দ্বন্দ্ব সহিংস রূপ নেয়। মো. আবদুল্লাহ সাবেক এমপি সোহরাবের অনুসারী। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর বিজয় দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন নিয়ে দু'পক্ষের সংঘর্ষে আরেকবার আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া দেখেন পাকুন্দিয়াবাসী। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া এবং ১৬ মে পাকুন্দিয়ায় আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির সম্মেলন নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দু'পক্ষ। পরে ১৯ মে আহ্বায়ক কমিটি বাতিল দাবিতে দু'পক্ষ পাল্টাপাল্টি সমাবেশও করে।

পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট মুখলেছুর রহমান বাদল বলেন, দুই নেতা পরস্পরের বিরুদ্ধে যা করছেন, তাতে দলের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে কোনো ইস্যু এলেই তাঁরা মারামারিতে লিপ্ত হয়। এখনই তাঁদের লাগাম না টানলে আগামী নির্বাচনে বেকায়দায় পড়বে আওয়ামী লীগ।

পাকুন্দিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুর ইসলাম রেনু বলেন, যোগ্য নেতার হাতে নেতৃত্ব না দিলে পরিস্থিতি এমন হওয়ায় স্বাভাবিক। এই দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আফজল বলেন, আমরা দুই নেতার কর্মী-সমর্থকদের ন্যক্কারজনক সংঘর্ষের ঘটনা কেন্দ্রকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করব।

এ বিষয়ে নূর মোহাম্মদ বলেন, পাকুন্দিয়ায় উপযুক্ত নেতা নেই। যাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে, তাঁকে কেউ পছন্দ করে বলে মনে হয় না। আমি এলাকার এমপি। লোকজন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে তাঁরা কেউ মারামারিতে জড়িত নয়। যোগ্য নেতার হাতে পাকুন্দিয়ার নেতৃত্ব এলে সবকিছু সমাধান হয়ে যাবে।

সোহরাব উদ্দিন বলেন, আহ্বায়ক হিসেবে দলীয় নানা কাজ আমাকে করতে হয়। কিন্তু কিছু করতে গেলেই বর্তমান এমপির কর্মীরা অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে নেমে পড়ে। অস্ত্রবাজি করে প্রতিটি দলীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়। পাকুন্দিয়াকে বাঁচাতে হলে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ জরুরি।