রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল্যায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। উচ্চ পদে প্রেষণে কর্মকর্তা আসায় আদি কর্মকর্তাদের আশাভঙ্গ ঘটে। যেন নিজ ঘরে পরবাসী তাঁরা।

পূর্বের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর স্থলে অধিকতর স্বাধীন বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্ম ২০০৪ সালে। দুদকের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিগত দিনে অনেক যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির আশা করতে করতে অবসরে গেছেন। অনেকে কাজ করেছেন প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে। দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেও কর্মচারীরা তাঁদের যোগ্য পদে যেতে পারছেন না। কর্মকর্তারা চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের কাজ করেও সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।

দুদকের নিজস্ব উপসহকারী পরিচালক থেকে সহকারী পরিচালক, সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক, উপপরিচালক থেকে পরিচালক এবং পরিচালক থেকে মহাপরিচালক পদে পদোন্নতি যেন সোনার হরিণ। বর্তমান কমিশন মূল্যায়ন করে পদোন্নতি দেওয়ার কাজ শুরু করলেও এর গতি মন্থর।

জানা গেছে, বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ে পরিচালক থেকে মহাপরিচালক হওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই নগণ্য। কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৮ বছরে মাত্র চারজন পরিচালক মহাপরিচালক হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে দুদকের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল্যায়ন না করা এবং পদোন্নতি না পাওয়ার হতাশা দানা বেঁধে উঠছে।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, 'আমরা কাউকে বঞ্চিত করব না। যাঁর যেটা প্রাপ্য সেটা দেওয়া হবে। তার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন না হলে অনেক সময় কাজও গতিহীন হয়ে পড়ে। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্দিষ্ট একটি সময় পার করতে হয়। মহাপরিচালক (ডিজি) হলেন সরকারের তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা, যা যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। সরকারের একজন যুগ্ম সচিবের এই পদে যেতে ১৭-১৮ বছর সময় লেগে যায়। দুদক প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর চলছে। এই সময়ে যাঁরা ডিজি পদের জন্য উপযুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হবে।'

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের ক্ষমতা আর দাপটে দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অনেক সময় নতজানু হয়ে থাকতে হয়। তাঁদের মধ্যে অনেকের কাজের মূল্যায়ন সন্তোষজনক নয়। অভিযোগ অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) প্রদান, বিচারিক কাজে সহায়তা- সবই করছেন দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তারা। দুদকের কর্মকর্তারা এসব কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ। অনেক সময় প্রেষণে আসা কর্মকর্তারা দুদকের কর্মকর্তাদের সহায়তায় দুদকের কার্যক্রম, আইন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। কিন্তু মূল্যায়নের খাতায় দুদকের কর্মকর্তাদের নাম থাকে না।

জানা গেছে, সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী প্রেষণে আসা উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা পরিচালক এবং যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা দুদকের মহাপরিচালক হচ্ছেন। এই দুটি পদ যেন প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের দখলে। দীর্ঘদিন ধরে দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কোনো মহাপরিচালক নেই। অথচ দুদকের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এই পদের জন্য দক্ষ ও যোগ্য পরিচালক রয়েছেন। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে সামগ্রিক কাজ করছেন তাঁরাই। অথচ দীর্ঘদিন থেকে তাঁরা বঞ্চিত। তাঁদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দুদকের সার্বিক কাজ গতিহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত ১৮ বছরে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বেড়েছে। এতে মূল অবদান দুদকের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। দীর্ঘ সময়ে মূল্যায়ন ও পদোন্নতি না হওয়ায় প্রেষণে আসা কর্মকর্তা ও খোদ কমিশনের প্রতি তাঁদের এক ধরনের ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিগত দিনে অনেক যোগ্য কর্মকতা উপপরিচালক থেকে পরিচালক ও পরিচালক থেকে ডিজি হতে পারেননি।

বর্তমানে আটটি ডিজি পদের সব কয়টিতে প্রেষণে আসা যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা নিযুক্ত রয়েছেন। প্রেষণে আসা উপসচিব পদমর্যাদার ১২ জন পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। বর্তমানে দুদকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তা ৩৯ জন।