কোনো দেশে মুড়ি-মুড়কির এক দর হলে সেই দেশের কী হাল হয়, সে গল্প আমরা সবাই জানি। সেই সাধুর গন্ধ আমরা অনেকে জানি, যিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে এক নতুন দেশে আস্তানা গেড়ে এক নবীনতম শিষ্যকে বাজারে পাঠালেন। সেই শিষ্য আনন্দে উত্তেজিত হয়ে বাজার থেকে ফিরে এসে গুরুকে জানাল, 'এমন ভালো দেশ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে তেল আর ঘি একই দামে পাওয়া যায়; মুড়ির যা দাম, মুড়কিরও তাই।' সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠলেন সাধু। কড়া নির্দেশ দিলেন, 'এই ভয়ংকর দেশে আর এক মুহূর্ত নয়।' সবাই চলে গেলেও সেই তরুণ শিষ্য গুরুর আদেশ লঙ্ঘন করে ওই দেশে রয়ে গেল। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো। কিছুদিন পর বিনা দোষে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গর্দান চলে গেল।
আমাদের ব্যবহারিক পরীক্ষার অবস্থাও প্রায় সেই দেশের মতো। সাম্প্রতিক কোনো এক বছরে আমি এক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে স্কুল-কলেজগুলোর ব্যবহারিক পরীক্ষার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, ভালোই, তবে মুড়ি আর মুড়কি আলাদা করা যাচ্ছে না। শিক্ষকদের নম্বর দিয়ে দেওয়ার যে প্রবল প্রবণতা তাতে মাঝেমধ্যে ভয় হয়, কখন না তাঁরা পরীক্ষার্থীদের ২৫-এ ২৬ দিয়ে দেন! মূলত চারটি কারণে মূল্যায়নটি এই পর্যায়ে নেমে এসেছে।
প্রথমত, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ; দ্বিতীয়ত অন্য স্কুলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, তৃতীয়ত, 'প্রিয় শিক্ষার্থী'দের আবদার এবং চতুর্থত কিছু স্কুলে ব্যবহারিক শ্রেণিকক্ষ ও বিজ্ঞান শিক্ষক না থাকার কারণে বেনিফিট অব ডাউট প্রয়োগ করা। এই কারণগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ হয়তো আগের চেয়ে বেড়েছে, কিন্তু অন্য কারণগুলো এখন যেমন আছে, আগেও তেমনই ছিল। তাহলে কেন এই পরিবর্তন? এর কারণ সম্ভবত এই যে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ যতটা বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে শিক্ষকদের নৈতিক মনোবল।
প্রসঙ্গটির অবতারণা করা হলো নতুন শিক্ষাক্রমের একটি বিধানের কথা মনে রেখে। ২০২৩ সালে যে শিক্ষাক্রম শুরু হওয়ার কথা, সেখানে মূল্যায়নের ৬০ ভাগ পরিচালিত হবে ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। প্রশ্ন উঠেছে, এতে কি মুড়ি-মুড়কির এক দর হয়ে যাবে না? তবে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর পক্ষপাতযুক্ত মূল্যায়নের সুযোগ থাকছে না। এখানে ব্যবহারিক পরীক্ষার মতো শিক্ষক যেন খেয়ালখুশি মতো নম্বর দিতে না পারেন, সে জন্য সম্ভবত কিছু ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রথমত, এ ক্ষেত্রে কোনো নম্বরই থাকবে না। শিক্ষার্থী কোন পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জন করেছে, শিক্ষক শুধু সেটা লিখবেন। সেটাও তিনি খেয়ালখুশি মতো লিখতে পারবেন না। একটি যোগ্যতার জন্য অনেকটি নির্দেশক থাকবে। সেগুলোর প্রতিটিতে শিক্ষার্থী কেমন করেছে, শিক্ষককে সেগুলো একটা একটা করে মূল্যায়ন করে সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ওই শিক্ষার্থী সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য লিখবেন। শুধু তাই নয়; তাঁর মূল্যায়ন যে যথার্থ- তা প্রমাণ করার জন্য কিছু প্রমাণও তাঁর হাতে রাখতে হবে। পরিবীক্ষণ কর্মকর্তারা এসব দেখে ঠিক করবেন মূল্যায়ন সঠিক হয়েছে কি হয়নি। আর মূল্যায়নের এই পুরো প্রক্রিয়াটি যদি একটা অ্যাপসের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়, তাহলে শিক্ষকের খেয়ালখুশি মতো মূল্যায়ন করার সুযোগ আরও কমে যাবে।
এত কিছুর পরও শিক্ষক নিজে যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করেন; জোর করে তাঁকে দিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করানো কঠিন এবং এ ধরনের জবরদস্তি শিক্ষকদের জন্য মর্যাদা হানিকরও বটে। আমার ধারণা, শিক্ষকরা এবার নিজ থেকেই দায়িত্বশীল হবেন। অবশ্য সমালোচকরা বলতে ছাড়ছেন না, এর আগে যে 'স্কুল বেজড অ্যাসেসমেন্ট' চালু করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা তো বাস্তবায়ন করা যায়নি। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে যে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ছিল, সেটাও তো এক সময় মুখ থুবড়ে পড়েছে।
কথাগুলো মিথ্যা নয়। কিন্তু আমরা যদি এই ব্যর্থতাকে আমাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের স্তম্ভ হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে যে চারটি কারণে ওই উদ্যোগগুলো অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছিল, সেগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথম সমস্যাটি ছিল যথাযথ শিক্ষক-প্রশিক্ষণের অভাব। এবার এখনও প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি বটে, তবে তার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষকের অবাধ স্বাধীনতা ছিল এবং সেই মূল্যায়ন সঠিক হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এবারও শিক্ষকদের স্বাধীনতা থাকবে তবে তা অবাধ নয় এবং আগেই বলেছি, তা যাচাই করারও ব্যবস্থা থাকবে। তৃতীয় সমস্যাটি ছিল, যে মাত্রায় ক্যাম্পেইন করলে শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সব প্রতিষ্ঠানে একযোগে সমানভাবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন বাস্তবায়ন করা যায়, সে রকম ক্যাম্পেইন করা হয়নি। সবাই মিলে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা না করলে স্কুলে স্কুলে প্রতিযোগিতার যে মনোভাব, তা আবারও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ক্যাম্পেইন করার কাজটি সরকারকেই করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষকদের যেভাবে বোঝালে তাঁরা বুঝবেন- সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন করলে আখেরে তাঁদেরই লাভ, সেভাবে বোঝানো হয়নি। বিশ্বাসযোগ্যভাবে মূল্যায়ন করে যদি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়; শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং যদি তার শ্রেণি শিক্ষকের দেওয়া নম্বরের ওপর নির্ভর করে; বোর্ডের অচেনা-অজানা পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের চাইতে যদি তাঁর দেওয়া নম্বরের ওজন বেড়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্র কিংবা সমাজের পক্ষে শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা যুগপৎ সহজ ও লাভজনক হবে। এবার শিক্ষকদের এই বোধটি জাগ্রত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২৩ সালের জন্য অপেক্ষা না করে এ বছর যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো আছে, সেগুলোর ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও কিন্তু শিক্ষকরা এই চর্চাটি শুরু করতে পারেন। তাঁরা যদি মুড়ি-মুড়কিকে একভাবে না দেখতে বদ্ধপরিকর থাকেন; তাঁদের এই নৈতিক মনোবলের কাছে সুবিধাসন্ধানী মানুষরা নত হতে বাধ্য হবেন। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হবে।
সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক: মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক, অধ্যাপক ও ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ