বাস্তবায়নের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে একটা সঠিক সিদ্ধান্তও কীভাবে অকার্যকর হয়ে যায়, তার একটা ধ্রুপদি উদাহরণ হতে পারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানির সিদ্ধান্তটি। মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরবাসীর সাড়া না মেলায় এবার ডিএসসিসি বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পশু কোরবানির জন্য কোনো এলাকা নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। ডিএনসিসি বা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ৩টি ওয়ার্ড ছাড়া আর সব এলাকায় নাগরিকদের ইচ্ছামতো জায়গায় পশু কোরবানি দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বলা হয়েছে, প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা খরচ করে কোরবানির জন্য কিছু স্থান নির্ধারণ করা হয়; কিন্তু নগরবাসী পশু কোরবানি দিতে সেখানে না আসায় ওই টাকা জলে যায়। আপাত অর্থে যুক্তিটি বেশ শক্ত, সন্দেহ নেই। কিন্তু কোরবানির সময়টাতে প্রতি বছর নগরজুড়ে পশুর বিষ্ঠা, রক্ত ও দেহাবশেষের যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয় এবং তার কারণে অন্তত সপ্তাহখানেক নগরবাসীকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়; আলোচ্য সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় তা মাথায় ছিল বলে মনে হয় না। তা ছাড়া যে টাকা বাঁচাতে নির্ধারিত স্থানে কোরবানির সিদ্ধান্তটি বাতিল করা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা যে বিক্ষিপ্তভাবে সংঘটিত কোরবানির কারণে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতে খরচ হতে পারে; সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল।
আমরা জানি, নির্ধারিত স্থানে কোরবানির জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে শামিয়ানা, ব্লিচিং পাউডার, পানি, চটসহ জবাইয়ের জন্য ইমাম এবং মাংস কাটার জন্য কসাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হতো। এ জন্য একটা বরাদ্দও রাখতে হতো। কিন্তু এ ব্যবস্থা সফল হলে খুব অল্প সময়ে অল্প জনবল দিয়ে সব ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করা সম্ভব ছিল। অন্যদিকে, কোরবানির পুরোনো ব্যবস্থাপনায় নগরজুড়ে সৃষ্ট বর্জ্য পরিস্কার করার জন্য দুই করপোরেশনকে যা করতে হয় তাকে রীতিমতো এক মহারণ বললে ভুল হবে না। আরও পরিহাসের বিষয় হলো, এত জনবল, যন্ত্র, গাড়ি, পানি, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি ব্যবহারের পরও যে এক সপ্তাহের মধ্যে সব বর্জ্য পরিস্কার করা যায়, তা নয়। অনেকের মনে থাকার কথা, নির্ধারিত স্থানে কোরবানি দেওয়ার নির্দেশনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জারি করে ২০১৫ সালে। ওই বছরই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। তখন উদ্যোগটির প্রশংসা করে বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে তা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তখন আমরাও বলেছিলাম, যত্রতত্র কোরবানি দেওয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যাস জনগণ রাতারাতি পাল্টাতে পারবে না। এ জন্য সরকার ও করপোরেশনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নিতে হবে। কিন্তু দেখা গেল, এসবের ধারেকাছে না গিয়ে শুধু কোরবানি ঈদের কয়েক দিন আগে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে নামকাওয়াস্তে কিছু প্রচার চালানো হলো। এমনও দেখা গেছে, অনেক এলাকার মানুষ জানেনই না, তাঁদের এলাকায় সিটি করপোরেশন নির্ধারিত কোরবানির স্থানটা কোথায়। কাজেই এসব দায়সারা উদ্যোগের ফল যা হওয়ার কথা তা-ই হয়েছে।
আসলে নির্ধারিত স্থানে এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাই করার গুরুত্ব সম্পর্কে খোদ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কতটুকু ওয়াকিবহাল, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সন্দেহটা এ কারণে প্রকাশ করা হলো যে, প্রায় একই সময়ে তারা রাজধানীতে কয়েকটি পশু জবাইখানা তৈরির সিদ্ধান্তও নিয়েছিল, যেগুলোর কোনোটাই এখনও আলোর মুখ দেখেনি। বরং ডিএনসিসির পুরোনো চারটি জবাইখানার মধ্যে দুটি এখন বন্ধ। আর ডিএসসিসি নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ার আগেই জবাইখানার জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। যদি বলা হয়, এ বিষয়গুলো আসলে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার প্রতি এবং বিশেষ করে জনস্বাস্থ্যের প্রতি সংশ্নিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ; তাহলেও ভুল বলা হবে না। যাই হোক, আমাদের প্রত্যাশা, সিদ্ধান্তটি দুই করপোরেশন কর্তৃপক্ষ পুনর্বিবেচনা করবে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

বিষয় : ধ্রুপদি উদাহরণ

মন্তব্য করুন