বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অব্যাহত সমর্থনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘে সেটাই ছিল বাংলায় প্রদত্ত প্রথম ভাষণ। এর পর থেকে জাতিসংঘ পরিচালিত সব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে অংশগ্রহণ করে আসছে।
'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়'- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত এই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সদাপ্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয়েই নয়; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী' আজ একটি অপরিহার্য নাম।
১৯৮৮ সালের ইউএন ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভেশন গ্রুপ (ইউনিমগ) মিশনে মাত্র ১৫ জন সেনা পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে যে অগ্রযাত্রার সূচনা; পরবর্তী বছরগুলোতে পেশাগত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। জাতিসংঘ মিশনের প্রথম দশকগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চড়াই-উতরাইয়ে পরিপূর্ণ ছিল। তবে নিঃসন্দেহে প্রথম দশকের অভিজ্ঞতা পরবর্তী দশকগুলোতে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বর্তমানে শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে ৯টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৫টি কন্টিনজেন্টকে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপাবিলিটি রেডিনেস সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নতুন কন্টিনজেন্টগুলো মোতায়েনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে এই কন্টিনজেন্টগুলোর মূল্যায়ন এবং অ্যাডভাইজরি পরিদর্শন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যে দুটি কন্টিনজেন্ট ইউএনপিসিআরএস, র‌্যাপিডলি ডেপ্লয়েবল লেভেল (আরডিএল) হিসেবে যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।
সংঘাতের প্রতিদ্বন্দ্বী যেসব দল বা গোষ্ঠী থাকে, তাদেরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে হয় যে, কাউকে আঘাত করা শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য নয়; বরং তাঁদের মূল উদ্দেশ্য বেসামরিক নাগরিক ও জাতিসংঘে কর্মরত সদস্যদের জানমাল রক্ষা করা। বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি আফ্রিকা মহাদেশের দেশে দেশে ১৫০টির বেশি মিলিশিয়া বাহিনীর নিরন্তর সংঘাতের পটভূমিতে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে নিবেদিতপ্রাণ নীল শিরস্ত্রাণধারী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
দেশ থেকে ৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে থেকেও করোনা অতিমারিতে ফোর্স ব্যানএমপির সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হতে পেরে পেশাগত জীবনে বিরল অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়েছে। জাতিসংঘ যেহেতু বহুজাতিক ফোর্স নিয়ে কাজ করে; বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর চিন্তাভাবনার সঙ্গে সমন্বয় করে; তাই ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের কমান্ডারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে সমন্বিতভাবে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং যথাযথভাবে তা সম্পন্নকরণ নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ, যা ফোর্স ব্যানএমপি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন
করে যাচ্ছে। 
ইউএন মিশনে যাত্রাকালীন অনিশ্চয়তা, অবস্থানের সময়কাল, নিজ ও পরিবারের প্রস্তুতির সময়সীমার অপর্যাপ্ততা, পরিবার-পরিজন থেকে দীর্ঘদিন আলাদা থাকা, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি, মিশনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ, মিশন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বিষয়ক অনিশ্চয়তা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েনের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ তৈরি করে, যা একজন আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষীর জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর ও চরম প্রতিকূল পরিবেশ মন ও মস্তিস্কে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায় যুদ্ধের নৃশংসতা ও ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে। এত চাপ সামলেও দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ মিশনগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে চলেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা ফোর্স ব্যানএমপির গর্বিত সদস্যরা। 
'সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে'- এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আজ বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি সুশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল বাহিনী বিশ্বের যে কোনো জায়গায় জাতিসংঘের ম্যান্ডেটে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে বৈশ্বিক শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য ও যুগোপযোগী অবদান রাখছে, যা নিঃসন্দেহে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বলতর করেছে। 
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের মতো একটি বহুজাতিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একদিকে সামরিক খাতে বৈশ্বিক অগ্রগতির কারণে সংগঠিত সব নীতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রত্যক্ষ অংশীদার হতে পারছে; তেমনি শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত সেনাসদস্যরা বিভিন্ন দেশের সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের বিভিন্ন ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন, সামরিক পেশাদারিত্ব, নৈপুণ্য বৃদ্ধি এবং আন্তঃব্যক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য নতুন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়া যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য অনস্বীকার্য।
শান্তিরক্ষা মিশনগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরোক্ষ আর্থিক সুবিধাও তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য কৃষি ও ওষুধ খাতগুলোতে নতুন বাজার সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে বাংলাদেশি বিভিন্ন কোম্পানি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষিজমি লিজ নিয়ে খামার স্থাপন করেছে, যা বাংলাদেশ ও লিজ প্রদানকারী দেশ উভয়ের খাদ্য চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে জাতি। তাঁর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে- এই হোক আমাদের সবার সুদৃঢ় অঙ্গীকার। 
মেজর ইমতিয়াজ পারভেজ: সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা