আবারও শুরু হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ঢাকায় এলাকাভেদে দিনে ৬-৭ বার লোডশেডিং হয়েছে। ঢাকার বাইরে কোনো কোনো এলাকায় ৫-৬ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। আষাঢ়ের তীব্র আর্দ্রতাজাত ভ্যাপসা গরমের মাঝে বিদ্যুতের এ আসা-যাওয়া জনজীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর কিছু নেই। আরও শঙ্কা হলো দেশের অর্থনীতি নিয়ে। এমনিতেই করোনা অতিমারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক কসরত করতে হচ্ছে।

এখন এ লোডশেডিং যদি অব্যাহত থাকে তাহলে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ভরসার জোগানদাতা শিল্প ও সেবা খাতের চাকা শ্নথ করে দিতে পারে। এমনকি কৃষি উৎপাদনেও তা বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ফলে বিদ্যুতের এই ঘন ঘন আসা-যাওয়া সাধারণ মানুষকে ভাবনায় ফেলেছে আগামী দিনগুলো কেমন যাবে তা নিয়ে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা বরাবরের চেয়ে অন্তত ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাচ্ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। আর জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে গ্যাসসহ জ্বালানির দাম অত্যধিক বেড়ে গেছে। ফলে গত কিছুদিন তাঁরা খোলাবাজার থেকে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বন্ধ রেখেছেন। তাই দেশে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য মানলে বর্তমান বিরূপ বিশ্ববাস্তবতাই বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের চলমান দুর্ভোগের কারণ, এটা মানতে হবে।

অবশ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারি এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। অন্তত সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া তাঁদের বক্তব্য পড়ে ও শুনে আমাদের তা মনে হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য হলো, বহু বছর ধরে তাঁরাসহ দেশের সচেতন মহল অভ্যন্তরীণ জ্বালানির উৎসগুলো অনুসন্ধানে তৎপর হতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন। যেমন, এখনও দেশের বিস্তীর্ণ ভূভাগ গ্যাস অনুসন্ধানের বাইরে আছে। এ অনুসন্ধানের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক বড় অঙ্কের একটা তহবিলও গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এ জন্য দেশীয় কোম্পানি বাপেক্স দূরে থাক; কোনো বিদেশি কোম্পানিকেও অন্তত উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কাজে লাগানো হয়নি। ভারত ও মিয়ানমারের কবল থেকে সেই ২০১৪ সালে বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করেছে বাংলাদেশ। সেখানেও আজ পর্যন্ত গ্যাস বা অন্য কোনো জ্বালানির জন্য অনুসন্ধান চালানো হয়নি। ভোলার গ্যাস দেশের মূল অংশে আনা যেহেতু অনেক সময়সাধ্য; বেশ কয়েক বছর আগে পরিকল্পনা হয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করে সে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করবে।

কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই পরিকল্পনা এখনও কল্পনাই রয়ে গেছে। বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় যতটুকু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল, তা যদি সময়মতো শুরু করা যেত তাহলেও আজকের এ ঘাটতি হয়তো অনেকাংশে এড়ানো যেত। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনির বিরুদ্ধে বিতর্কিত উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির কারণে গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, সরকার চাইলে অন্য দেশীয় কয়লা খনিগুলো থেকে ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে কয়লা তুলে কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাও এক ধরনের অরণ্যে রোদন। অভিযোগ আছে, দেশের জ্বালানি ব্যবসায়ে আমদানি লবি শক্তিশালী হওয়ার কারণেই প্রথমদিকে দেশকে জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কথা বলেও সরকার গত কয়েক বছরে গোটা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করে তুলেছে। এ যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে কতটা হুমকির মুখে ফেলতে পারে তা সেদিন দেশের নীতিনির্ধারকরা ভাবতে না পারলেও আজ নিশ্চয় অনুভব করছেন।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণেই এখন দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ সভ্যতার অন্যতম চালিকা শক্তি বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। এক যুগ আগের বিভীষিকাময় লোডশেডিং প্রায় জাদুঘরে যেতে বসেছিল। তারপরও এটা বলতে হবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতবিষয়ক চলমান নীতিমালা যদি অবিলম্বে সংশোধন করা না হয় তাহলে এ জন্য সরকারের পাশাপাশি জাতিকেও চরম মূল্য দিতে হতে পারে। আপাতত লোডশেডিং মেনে নিতে হবে, সন্দেহ নেই। তবে আমাদের প্রত্যাশা, এর কষ্টটা যাতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত হয়।

বিষয় : প্রদীপহীনতা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন