চোখে শূন্য দৃষ্টি। তাকিয়ে আছে কিন্তু কিছু দেখছে বলে মনে হয় না। তীব্র ভয় আর আতঙ্ক মুখের প্রতিটি রেখায়। অস্ম্ফুটে কী যেন বলতে গিয়েও থেমে যায় বারবার। প্রশ্ন করলে চারপাশ তাকিয়ে দেখে, কেউ শুনছে কিনা। মানুষের ভিড় তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়। একা হলে ফিসফিস করে বলে- 'ভয় লাগে, এমন তো একাত্তরেও হয় নাই।'
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়া গ্রামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা সম্প্রতি সেখানে গিয়েছিলাম। দলের ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি টিম ছিল পরিদর্শনে। এই শূন্য অসহায় দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত আমি। এর আগে ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের পর দল থেকে গিয়েছিলাম অসহায় মানুষদের কথা শোনার জন্য। বহু যুগ ধরে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি সম্প্রীতির সঙ্গে বাস করার পর হঠাৎ এই হামলার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না হতবিহ্বল মানুষ। কী তাদের অপরাধ? কেন নিজ ঘরে তারা অনিরাপদ?
দীঘলিয়ায় যেভাবে হামলা হলো সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর, তা একেবারে নতুন কিছু নয়। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া কক্সবাজারের রামু, পাবনার সাঁথিয়া, কুমিল্লার হোমনা, যশোরের মালোপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা, বরিশালের বানারীপাড়া, নেত্রকোনার কলমাকান্দা, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ কিংবা এই কিছুদিন আগে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুর, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঠিক যেভাবে, যে ছুতায় হামলা হয়েছে; এবারের হামলাও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
ঘটনার সূত্রপাত সেই 'ধর্ম অবমাননাকারী ফেসবুক পোস্ট' দেওয়ার কথিত অভিযোগ। দীঘলিয়া নামক যে গ্রামে এই তাণ্ডব চলে সেটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম, যেখানে ১৫টির মতো মুসলিম আর ১১০টির মতো হিন্দু পরিবারের বাস। আমরা যে পাড়াটিতে যাই, সেটি সাহাপাড়া নামেই পরিচিত। তাঁরা বলছিলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওই গ্রামে তাঁদের বাস হলেও এই প্রথম বড় এক হামলার শিকার হলেন। ঘটনার পর বেশ কিছুদিন পার হলেও এখনও বেশিরভাগ বাড়ি ফাঁকা। অধিকাংশ বাড়িতেই বয়স্ক নারী-পুরুষ ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। চারপাশে ভীতিকর এক পরিবেশ।
লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানালেন, ভুক্তভোগীরা কেউ মামলা করতে রাজি না হওয়ায় পুলিশই বাদী হয়ে মামলা দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, আসামি কয়জন? জানালেন, ২০০ আসামির সবাই অজ্ঞাত। আরও জানালেন, ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে; দু'জন নাকি স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে আসামিদের নাম জানাতেও। প্রশ্ন করলে বলছে, সন্ধ্যার আজানের পর ঘটেছে তাণ্ডব। অন্ধকারে কাউকে চিনতে পারেননি তাঁরা।
আইনজীবী হিসেবে জানি, কোনো মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি পুরো মামলাকেই দুর্বল করে দেয়। পুলিশ তার নিজের সুযোগ-সুবিধা, পছন্দমতো আসামির তালিকা তৈরি করে। অতীতে দেখা গেছে, এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন বিরোধী দলের নেতাকর্মী আর সাধারণ মানুষ। পুলিশ বিরোধী দলের কর্মীদের চাপে রাখার জন্য আর মামলা-বাণিজ্যের অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষকে আসামি করে এ ধরনের মামলায়। ঠিক সে কারণেই গত ১৫ বছর ধরে ঘটে চলা একটির পর একটি ঘটনার কোনোটিরই সুরাহা হয়নি আজ অবধি। এখন পর্যন্ত দেখিনি একটি মামলায় সঠিক তদন্ত হয়ে আসামি ধরা পড়েছে কিংবা একটি মামলার রায় হয়ে সেই রায় কার্যকর করা হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনায় একই চিত্র। প্রথম কিছুদিন খুব হৈচৈ, সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি, টকশোর টেবিলে ঝড়, রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, বিরোধী দলের কর্মীদের অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় ফেলে গণগ্রেপ্তার। তারপর সব চুপ। এখন পর্যন্ত একটিরও সুষ্ঠু তদন্ত আর বিচার না হওয়াই খুলে দিয়েছে একই ঘটনার আরেকটি পথ। এর অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ ভিটামাটি হারিয়েছে তারা। হারিয়েছে সামান্য যে সম্বল ছিল সেটাও। রিক্ত-নিঃস্ব এসব মানুষ বাপ-দাদার ভিটা ছেড়েছে নীরবে-নিঃশব্দে।
গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘুর ওপর যে ক'টি হামলা হয়েছে, এর প্রায় সব ক'টিই ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি এমন ঘটনাও আছে, যেখানে যার আইডি থেকে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এসেছে, সে লেখাপড়াই তেমন জানে না। কেউ বলছে, তার কোনো ফেসবুক আইডি নেই। আজকে প্রযুক্তি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যদি কেউ সত্যিই এমন স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে, তাহলে কার আইডি; কোন ডিভাইস থেকে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে তার সবই মুহূর্তে বের করে ফেলা সম্ভব। আমরা দেখি, সরকারি দলের কোনো নেতা-নেত্রী বা সরকারের সমালোচনা করে কেউ কিছু লিখলে দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু কথিত ধর্ম অবমাননার এসব ক্ষেত্রে অদ্ভুত নিষ্ফ্ক্রিয়তা দেখি তাদের।
আমার পর্যবেক্ষণ- বেশিরভাগ সময়ই ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সংখ্যালঘুর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এমনকি নড়াইলের এই ঘটনার পরপরই ওই এলাকার আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, তাঁকে কেউ টার্গেট করলে পেছন থেকে আঘাত না করে তারা যেন সামনে এসে লড়াই করে। তিনি আরও বলেন, 'আপনারা ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে আমাকে আঘাত করবেন না। আমিই যদি অ্যাটাকের কেন্দ্রবিন্দু হই, তাহলে আমাকে সরাসরি আঘাত করেন।' দলীয় কোন্দল বুঝতে এর চেয়ে বেশি কথার প্রয়োজন নেই।
নড়াইলে অল্প দিনের ব্যবধানে দুটি ঘটনা ঘটল। প্রথমটি সনাতন ধর্মাবলম্বী কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানো। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা কলেজ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা পেতে এই নিন্দনীয় কাজে জড়িয়েছেন। আর দীঘলিয়ায় হামলায়ও দলটির একটি অংশের মদদ, অন্তত নিষ্ফ্ক্রিয়তার কথা জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই বলছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলার মতো মনস্তাত্ত্বিক বিষয় দুটি ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে।
রামু থেকে নাসিরনগর; শাল্লা থেকে নড়াইল; গল্প তো সেই একই। প্রতিটি ঘটনায় বসতভিটা, দোকান, ঘরে থাকা টাকাপয়সা, স্বর্ণালংকার সব হারিয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়। আতঙ্কিত হয়েছে; নীরবে চোখের জল ফেলেছে; বাপ-দাদার ভিটা ফেলে দেশ ছেড়েছে তারা। ভোটের হিসাব যখন ছিল, তখন তা এক রকম। এখন তো দেশ ছাড়লেই লাভ। জমিটুকু পাওয়া যাবে সহজেই। 'থাকলে ভোট, গেলে জমি'- এই মন্ত্রের রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি রামু থেকে নড়াইল। যতদিন সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার না হবে; যতদিন ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকারের লক্ষ্যবস্তু থাকবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; যতদিন অদৃশ্য কোনো কারণে ঘটনার সময় পুলিশ প্রশাসন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকবে, ততদিন এই ঘটনাগুলো ঘটা বন্ধ হবে না।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা: সংসদ সদস্য, কলাম লেখক