স্মৃতি গদ্য নয়। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো স্মৃতি নেই। শুধু আমাতে আছে তাঁর প্রাণ। আমার ধমনিতে প্রবাহিত তাঁর রক্ত। আমি তাঁর রক্তের উত্তরাধিকার, তাঁর চেতনার উত্তরাধিকার। তিনি শহীদ শেখ মাহাতাব উদ্দীন মণি। 'মণি চেয়ারম্যান' বলেই পরিচিতি ছিলেন সবার কাছে। এলাকার ছোট-বড় সবাই তাঁকে 'দাদা ভাই' বলে ডাকতেন। ১৯৭১ সালের ২৮ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হন তিনি। শহীদ হন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করার জন্য। তিনি আমার বাবা। বাবাকে যখন হায়েনারা গুলি করল, তখন টার্গেট ছিল তাঁর মাথা। শত্রুর কাছে নতিস্বীকার না করায় উন্নত শিরে দীর্ঘদিন এলাকায় নেতৃত্বে থাকা মেধাবী মাথাটাই গুঁড়িয়ে দিতে হবে- এই ছিল হায়েনাদের টার্গেট।

তিনি এলাকায় অজস্র জনকল্যাণমুখী কাজ করেছেন। পাইকগাছা হাই স্কুলটি জুনিয়র স্কুল থেকে হাই স্কুল পর্যায়ে (ম্যাট্রিক) উন্নীতকরণ, তৎকালীন সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমীনকে সঙ্গে নিয়ে পাইকগাছা কলেজ প্রতিষ্ঠা, কাজী ইমদাদুল হক সড়ক নির্মাণ, মেহের মুসল্লি সড়ক, সরলের দিঘি সংস্কারের মতো বড় বড় উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। যার সুফল এখনও এলাকার মানুষ ভোগ করছে। সংস্কৃতিমনা মানুষটির ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর লাইব্রেরিও তছনছ করে ফেলে হায়েনার দল। তবুও কিছু বই এখনও রয়ে গেছে। অনেক ইংরেজি উপন্যাসের পাশে তাঁর হাতের লেখা নোট দেখতে পাই। প্রতি বছর অন্তত একবার থিয়েটার করাও ছিল তাঁর নেশা। সেখানে পুরুষরাই নারীর চরিত্রেও অভিনয় করতেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মণি মিয়ার অবদান এলাকার মানুষ আজও স্মরণ করে। '৭০-এর নির্বাচেনে বঙ্গবন্ধু পাইকগাছায় নির্বাচনী জনসভার কর্মসূচি দিলে মুসলিম লীগ ও জামায়াত নেতৃবৃন্দ পল্টনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকে। বয়েজ স্কুলের মাঠে জনসভার প্যান্ডেল তৈরিতে তারা বাধা দিলে লেখক (মণি মিয়ার বড় সন্তান, আমার বড় ভাই যুদ্ধচলাকালে মুজিব বাহিনীর কমান্ডার শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু) কর্মীদের সংঘবদ্ধ করে দা নিয়ে এগিয়ে গেলে তারা সরে পড়ে। কিন্তু মণি মিয়া সাবধানতার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শেখ মো. আফতাব উদ্দিনের নেতত্বে একদল যুবকর্মীকে বাড়িতে লাঠিসোটাসহ মোতায়েন রাখেন। দেরিতে আসার জন্য বঙ্গবন্ধুর আর মাঠে জনসভা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু রাত ১০টার দিকে আওয়ামী লীগ অফিসে এলে তিনি (শহীদ শেখ মাহাতাব উদ্দীন মণি) তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন এবং নির্বাচনে সাধ্যমতো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বঙ্গবন্ধু মাঠের ঘটনা গফুর সাহেব ও তাঁর (মণি মিয়া) কাছ থেকে জানতে পারেন।' (পাইকগাছা ও বয়রা থানার স্মরণীয় ও বরণীয় যারা :শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু)

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি থানা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন স্থানে মানুষকে স্বাধীনতার পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি সভা করেন। ২৮ মার্চ পাইকগাছা বাজারে জনসভায় তিনি বলেন, 'রক্ত ছাড়া স্বাধীনতা আসবে না। আসুন, আমাদের যাদের বয়স হয়েছে, তাঁরা রক্ত দিয়ে আমাদের সন্তানদের স্বাধীন বাংলায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার পথ সুগম করে দিই।'

তাঁর সেই কথা বোধ হয় আল্লাহ কবুল করেছিলেন। তিনিসহ ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে স্নাত এই দেশ, বাংলাদেশ। আমাদের বেঁচে থাকার পথও আজ জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরির দক্ষ নির্দেশনায় সুগম।

মণি চেয়ারম্যান আগে মুজাহিদ ক্যাপ্টেন ছিলেন বলে তিনি ও সাবেক নেভির সদস্য ডাক্তার মোজাম আলী এলাকার তরুণদের তালিকা করে ফুটবল খেলার মাঠে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন এবং তাঁর বড় সন্তান শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু এবং ছোট ভাই শেখ বেলাল উদ্দীন বিলু (পরবর্তীতে চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভাপতি) কেউ ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠান। ৫ এপ্রিল ক্যাপ্টেন আসিফ কার্গো লঞ্চ নিয়ে পাইকগাছায় গিয়ে তাঁকে জানান, তিনি অস্ত্র আনতে ভারতে যাচ্ছেন। এ সময় তিনি তাঁর দুটি বন্দুক (একটি তাঁর এবং একটি আমার মায়ের নামে লাইসেন্স করা ছিল) নিয়ে শিববাটি এলাকায় নর-নারীদের পাহারা দেন। ২৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শহীদ এমএ গফুর (এমএনএ) স্বাধীন বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ শেখ মাহাতাব উদ্দীন মণি মিয়াকে পাইকগাছা থানার প্রশাসক নিয়োগ দেন, যা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এমপি স ম বাবর আলী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবল চন্দ্র মণ্ডল বহন করে এনে তাঁর হাতে তুলে দেন।

২৭ জুলাই গভীর রাতে হঠাৎ তাঁর বাড়ির সদর দরজা ভেঙে আঙিনায় ঢুকে পড়ে বিশাল এক রাজাকার বাহিনী (সম্ভবত ৩৫ জনের মতো)। তিনি তখন গভীর ঘুমে। ঘরের দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় আমার মায়ের। বাবাও উঠে পড়েন। তাঁর ওই দিন শেষ রাতে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। বাবা-মায়ের মাঝখানে ঘুমিয়ে ছিল আমার ১ বছর বয়সী ভাই শেখ আনিছুর রহমান মুক্ত (বর্তমানে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য)। বাবা উঠে দরজা খুলতে চাইলে বাধা দেন মা। তিনি বাবা দরজার খিল উঁচু করে খুলতে যাচ্ছিলেন। মা সেটি ধরে ঝুলে পড়েন। এ সময় আবার জানালায় রাইফেলের বাঁট দিয়ে শব্দ করে রাজাকারের দল। তখন আমার মা আমার বাবাকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভাই মুক্তকে একটা কাঠের বাপের আড়ালে শুইয়ে দিয়ে জানালা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজকাররা আমার মায়ের পেটে একটি এবং বুকে একটি রাইফেল তাক করে দরজা খুলতে বলে। উল্লেখ্য, তখন আমি মাতৃগর্ভে ছিলাম।

সঙ্গে সঙ্গে আড়াল থেকে ছুটে আসেন আমার বাবা এবং আমার মাকে জোর করে সরিয়ে দিয়ে দরজা খুলতে বলেন। মা তখনও চেষ্টা করছিলেন যাতে বাবা দরজা না খুলে দেন। কিন্তু আমার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন জোর করলে তারা হয়তো সপরিবারে আমাদের হত্যা করবে। তারা সবাই ছিল সশস্ত্র। অপর পক্ষে আমাদের বাড়িতে কয়েকজন চৌকিদার ছিলেন পাহারারত। তাদের হাতে লাঠি ছাড়া কিছুই ছিল না। 

বাবার অন্য একটি বাড়িতে আমাদের বড় মা (বাবার প্রথম স্ত্রী) সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। তাঁরাও বিপদে পড়তে পারতেন। বাবাসহ গ্রামের আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জেলা বোর্ডের ওভারশিয়ার শাহ সৈয়দ শাসসুর রহমানের পুত্র মিজান, গাজী শামসুর রহমান, মনোহর এবং মালোপাড়ার বিনোদকেও ধরে নিয়ে যায়। বাবাসহ অন্য সবাইকে শিলেমানপুরে কপোতাক্ষ নদের ধারে নিয়ে গিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড় করায়। আমার বাবা নদীতীরের দিকে থাকায় তিনি নদীতে লাফিয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর হাত পেছনে বাঁধা থাকায় তিনি নদীর স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তিনি যখন বাঁচার আশায় মাথা ওপরে তুলছিলেন এবং আবারও ডুবে যাচ্ছিলেন, তখন রাজাকাররা তাঁর মাথা টার্গেট করে এবং বলে, 'শালার মাথায় গুলি কর। দেখ শালার মাথায় কী আছে।'

গুলিটা যখন তাঁর মাথায় এসে লাগল, তখন তাঁর মাথার বাঁ পাশটা ভেঙে পড়ল আর সেই রক্ত এসে ভিজিয়ে দিল তাঁর বুক আর পকেটে থাকা একটি রুমাল। রুমালটিতে লাল এবং সবুজ সুতায় ফুল তোলা। আমার মায়ের হাতের কাজ। ফুলের পাশে দুটি নামের আদ্যাক্ষর। আবার বাবার এবং মায়ের। 

বাবার লাশ কপোতাক্ষের জলে ভাসছিল। স্থানীয় লোকজন তাঁর মৃতদেহ তুলে এনে আমাদের শোবার ঘরের সামনে যেখানে রেখেছিল, সেখানে আমার মা একটি কামিনী ফুলের চারা রোপণ করেছিলেন। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই আমার মাকেও সমাহিত করা হয়।

বাবার বুক পকেটে থাকা রক্তে ভেজা রুমালটা আমার মাকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া গুলিতে বাবার মাথাসহ বাঁ কাঁধের দিকটা গুলিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাঁর পরে থাকা গেঞ্জিটা কাঁচি দিয়ে কেটে খুলতে হয়। সেটিও মায়ের হেফাজতে ছিল দীর্ঘদিন। এরও কয়েক মাস পর স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমার জন্ম হয়। যতদিন বাড়িতে ছিলাম, মায়ের ডানার নিচে থাকতাম। বুঝতাম না বাবা কাকে বলে। মা-ই আগলে রাখতেন। ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে।

পরবর্তীতে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার লক্ষ্যে বাড়ি ছাড়ি এবং হোটেলে থাকি, তখন আমার মা আমাকে বাবার মৃত্যুর সময়ে পড়ে থাকা কাঁধের স্থানটা কাঁচি দিয়ে কাটা গেঞ্জি আর রঙিন সুতায় কাজ করা রুমাল, যেটিও বাবার রক্তে ভেসে গিয়েছিল, সে দুটি আমাকে দিয়েছিলেন সঙ্গে রাখার জন্য। 

বিএল কলেজ বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতে যে কতবার আমি ওগুলো আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়েছি, কত বর্ষার দুপুরে যে ওগুলোর ঘ্রাণ নিয়েছি, সে শুধু আমিই জানি। এখন বাবার রুমাল, গেঞ্জি এবং কয়েকটি শার্ট, প্যান্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে আমার মায়েরও ব্যবহূত শাড়ি। ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য। ঘ্রাণে সঙ্গে সঙ্গে মাকে চোখের সামনে দেখতে পাই। যাকে চোখে দেখিনি, সেই শহীদ বাবাও যেন আমার সামনে এসে দাঁড়ান। আমি তাঁকে দেখতে পাই। আমার তখন আশ্রয় হয় রবীন্দ্রনাথে-

আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা-আপন সে কি, 

অন্ধকারে হঠাৎ তারে দেখি।