এক বিধবার ছেলে। গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করেছেন। এর পর উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে জেলা সদরের কলেজ থেকে স্নাতক করেছেন। চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক। আশা করছেন, শিগগিরই একটি চাকরি জুটে যাবে। শান্তি নেমে আসবে অভাব-অনটনের সংসারে। ঘরে মা ছাড়াও ছোট এক বোন। ছেলেটি যখন স্কুল-কলেজের পর্ব একে একে শেষ করতে থাকে, মা বছর গুনতে থাকেন। ছেলে তাঁর একের পর এক পাস দিয়ে যাচ্ছে। একটি করে বছর যায় আর মায়ের স্বপ্ন কাছে আসতে থাকে। মা হাতের আঙুলে কড় গুনতে থাকেন- কলেজের দুই বছর গেল; অনার্সের চার বছর গেল; সামনে মাস্টার্সের দুই বছর গেলেই পড়াশোনা শেষ। ছেলে তাঁর চাকরির বাজারে যোগ্য হবে। দূর হবে তাঁর এতদিনের অপেক্ষা। সংসারের ছোট মেয়েটি অপেক্ষা করে, ভাইয়ের একটি ভালো চাকরি হবে। বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের গল্প প্রায় এ রকমই।
একটি ছেলে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্রত্ব শেষ করতে সর্বোচ্চ ২৬-২৭ বছর ব্যয় করে। ২৬-২৭ বছর ধরার কারণ, এর মধ্যে সেশনজট থেকে শুরু করে নানা বিপত্তি হাজির হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দুই বছর, স্নাতক পর্যায়ে চার বছর এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দুই বছর সময় দরকার হয়। তবে স্নাতক পর্যায়ের চার বছরের শিক্ষা অনেক সময় সেশনজটের কবলে পড়ে শেষ করতে ছয় বছর লেগে যায়; এমন হিসাব সংবাদপত্রের বয়ানে আমরা জানতে পারি। আবার সরকারের সংশ্নিষ্টরা সব সময়ই বলে আসছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সেশনজট কমিয়ে আনার জোর চেষ্টা চলছে।
এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। দ্রুত পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ছাত্রত্ব শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরিবর্তে নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বছরের পর বছর ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে সংগ্রামরত যুবকের সন্ধানও আমরা পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানতে পারি। এই যে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে দুই ছাত্রের লড়াই- এর পেছনের কাহিনি নিয়ে বেশ তুলনা হতে পারে। একজন চাচ্ছেন দ্রুত ছাত্রত্ব শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে; অপরজন চাচ্ছেন ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হয়েই থেকে যেতে।
এমনই এক ছাত্রের সন্ধান আমরা পাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইকবাল হোসেন টিপু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র। ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা। কীভাবে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখে নেতৃত্ব ধরে রাখতে হয়- এ বিষয়ে কোনো গবেষণাপত্র চেয়ে ঘোষণা দেওয়া হলে তাঁর চেয়ে যোগ্য আর কেউ ভূ-বাংলায় আছেন কিনা, আপাতত বলা যায় না। পাঁচ বছরের পড়াশোনা কৌশলে কীভাবে এক যুগ পার করা যায়, এমন কৌশল তাঁর রপ্ত আছে। এই কৌশলের কথা জেনে গেলে বিদেশ থেকে হয়তো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দলে দলে গবেষকরা আসতে শুরু করবেন। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এগিয়ে থাকতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অল্প টাকার চা-চপ-শিঙাড়াকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিদেশের কেউ এই ঘটনা জেনে গেলে গবেষণা করতে পারে। এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রের ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখার মন্ত্র বিদেশিরা জেনে গেলে গিনেস রেকর্ডে নাম উঠে যেতে পারে!
সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রায়ই শোনা যায়, মধ্যবয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চলেছেন কেউ। আবার দেখা যায়, নিজের সন্তানের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষার টেবিলে বসছেন কোনো গৃহিণী। এর বিপরীতমুখী খবরও দেখা যায়। যেমন- ১২ বছর বয়সে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন কিংবা ১৫ বছর বয়সে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন। তবে এসব ঘটনা যেন স্পর্শ করতে পারেনি চট্টগ্রামের সেই ছাত্রকে। তিনি এক যুগেও পরীক্ষার টেবিলে বসতে পারেননি। শৈশবে ছড়া কেটেছিলাম- 'ছাত্রজীবন মধুর জীবন, যদি না থাকে এক্সামিনেশন'। সেই ছড়া যে বাস্তবে দেখা মিলবে, তা কি আমরা জানতাম?
এহ্‌সান মাহমুদ: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক