নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দা ফেরদৌসী আলম নীলার বিরুদ্ধে জমি দখলসহ নানা দুর্নীতি ও বেআইনি কাজে লিপ্ত হওয়ার যত অভিযোগ উঠেছে, তাতে সত্যিই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। প্রশাসনিক ক্ষমতার বিচারে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এমন কোনো বড় পদ নয়। তিনি একই সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হলেও স্রেফ এই পদ দিয়ে কারও পক্ষেই এতটা প্রভাবশালী হওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁর এই ক্ষমতার উৎস যা-ই হোক; রাজধানীর অদূরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের গড়ে তোলা নতুন শহর পূর্বাচলে তাঁর দাপটের সামনে প্রতিবাদ করার সাহস আপাতত কারও নেই, এটাই বাস্তবতা। মঙ্গলবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাচলে ৩০০ ফুট রাস্তার পাশে ক্রীড়া কমপ্লেক্সের জন্য সংরক্ষিত বিশাল সম্পত্তির ওপর তিনি নিজ নামে নীলা মার্কেট বানিয়ে সেখানে লাখ লাখ টাকা সেলামির বিনিময়ে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। মার্কেটের পাশেই আরেকটি প্লট দখল করে বানিয়েছেন ক্লাব; প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত জায়গার ওপর তৈরি করেছেন লেডিস ক্লাব; পূর্বাচলে একটি কনভেনশন সেন্টারের জন্য বরাদ্দকৃত শতকোটি টাকার ৭৬ কাঠা জমি নিয়ে রেখেছেন নিজের কবজায়; শীতলক্ষ্যার তীরে প্লট দখল করে সেখানে চালাচ্ছেন কয়লা-পাথর-বালুর কারবার; ইউসুফগঞ্জ খালের ওপর তৈরি করেছেন নিজের বাড়ি। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি দীর্ঘদিন দখলে রেখেছেন স্থানীয় কলেজের সভাপতির পদ। এমনকি মন্দির-শ্মশানের প্লটে উঠিয়েছেন দোকান।
অস্বীকারের অবকাশ নেই, রাজউকের কোনো অসাধু চক্রের সহায়তা ছাড়া নীলার পক্ষে পূর্বাচলের মতো সরকারি আবাসন প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর দখলে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনেও বলা আছে, দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, নীলা কনভেনশন সেন্টারের জায়গা দখল করেছেন তৎকালীন রাজউকের চেয়ারম্যানসহ আরও কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়। এ জন্য আদালতের নির্দেশে দুদক নীলা, রাজউকের ওই সাবেক চেয়ারম্যানসহ তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মামলাও করেছে। আমাদের প্রত্যাশা, এ মামলা সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে বিচারের পর্যায়ে যাবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবেন। এখানে বলে রাখা দরকার, দুর্নীতি দমনের জন্য তৈরি হলেও দুর্নীতির প্রতিকার ও প্রতিরোধে দুদকের ট্র্যাক রেকর্ড দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভালো নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেকবারই দেখা গেছে, যখনই কোনো দুর্নীতির ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের কারও নাম এসেছে; দুদক সে ঘটনাটি দেখেও না দেখার ভান করেছে। জনমতের চাপে শেষমেশ ওই ঘটনায় তদন্ত, এমনকি মামলা করলেও তার বিচার দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ে যায়। এর ফলে শুধু যে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে, তা নয়; বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সংশ্নিষ্ট অপকর্মকারীরা আরও দ্বিগুণ বেগে তাঁদের অপকর্ম চালাতে থাকেন। আমরা মনে করি, দুদক যদি এই উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে উপর্যুক্ত মামলাটি পরিচালনা করে, তাহলে দুর্নীতিবাজদের জন্য তা একটা জোরালো বার্তা দেবে।
নীলার মদদদাতারা যে যথেষ্ট ক্ষমতাধর- তা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। ওইসব খুঁটির জোরেই তিনি নীলা মার্কেটসহ তাঁর দখলকৃত বিভিন্ন জায়গার স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার পরও ওই জায়গাগুলোতে আবারও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। এমনকি উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে তিনি কলেজ কমিটির সভাপতির পদে বহাল আছেন। এ কথা বোঝার জন্য কাউকে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না যে, ক্ষমতাবলয়ের ব্যক্তিবর্গের ইন্ধন ছাড়া নীলার পক্ষে এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠা সম্ভবপর নয়। এখানে শাসক দলের নেতৃত্বেরও অনেক কিছু করণীয় আছে বলে আমরা মনে করি। তাঁদের বুঝতে হবে, এক দশকের বেশি সময় ধরে তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন। এ সময়ে জমি-বন-নদী দখল; আর্থিক কেলেঙ্কারিসহ যত বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, এর প্রায় সবক'টিতেই কোনো না কোনোভাবে শাসক দলের লোকের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একদিকে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আরেকদিকে জনমনে শাসক দলের ভাবমূর্তিতে কালিমা লাগছে। তাই তাদের নীলার মতো দখলবাজ ও পরের সম্পদ হরণকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এ ধরনের অপকর্মের কঠোর শাস্তির পথ পরিস্কার করতে হবে।

বিষয় : চক্ষু চড়কগাছ

মন্তব্য করুন