বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১-৫ বছর বয়সী শিশুদের সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তত্ত্বাবধানের জন্য শিশুযত্ন কেন্দ্র; ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর রক্ত সঞ্চালন ও শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার কৌশল এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব। এসব ব্যবস্থা স্বল্প খরচে এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় করা সম্ভব, যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের জন্য উপযোগী। সাঁতার ও পানি থেকে উদ্ধার কৌশল শেখা যেমন পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের টিকা, তেমনি শিশুর সুরক্ষার জন্য সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান এবং পানি থেকে উদ্ধারের পর সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত রেজুলেশন গ্রহণের মধ্য দিয়ে 'বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস'-এর স্বীকৃতি পেয়েছে ২৫ জুলাই। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ১০টি বিষয় নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে জাতিসংঘ। যেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা তৈরিসহ সংশ্নিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয় উল্লেখযোগ্য।
এ বছর বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করেছে 'সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ব কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং শিশুর সাঁতার প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রকল্প।' এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। সংশ্নিষ্ট সরকারি-বেসরকারি অংশীজনের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও ঘোষণা করা হয়েছে। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে অংশীজনের সমন্বিত সম্পৃক্ততায় জাতীয় নীতি ও কর্মকৌশল প্রণয়নের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।
ইতিবাচক উদ্যোগের শুরু হলেও এগুলোর সফল বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও কাজ করছে। 'পানিতে ডুবা প্রতিরোধ' বিষয়কে সব অংশীজনের সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ জটিল প্রক্রিয়া। যেখানে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করাসহ অন্যান্য অংশীজনের কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং প্রচারণার ক্ষেত্রে পানিতে ডুবা প্রতিরোধকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে এবং গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার এখনই সময়।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০-এর কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রা পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে শিশুমৃত্যু হ্রাস; স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রশমন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ; শিশুর বিকাশ, সুরক্ষা ও পরিচর্যার নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন।
সরকার নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি কর্মপরিকল্পনার স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগী হবে। বেসরকারি অংশীজন প্রতিরোধ কর্মসূচির প্রসার, গবেষণার মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নীতিনির্ধারকদের সম্পৃক্ত করে অব্যাহতভাবে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও তা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ, অন্যান্য সহযোগী অংশীজনের ধারাবাহিক উদ্যোগ, সংবাদমাধ্যমের শক্তিশালী প্রচারণার সমন্বয়ে জনগণের মনে বিশ্বাস আনতে হবে- 'পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রয়োজন সচেতনতা আর সঠিক কৌশলের প্রয়োগ।' যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের শুরুটা ধীরে হলেও সবার সমন্বিত চেষ্টা তাকে বেগবান করে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করা এবং সব অংশীজনের সমন্বিত সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই।
জুলিয়েট রোজেটি: পলিসি অ্যান্ড পার্টনারশিপ ম্যানেজার, ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ ডিভিশন, সিআইপিআরবি