মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন দাপ্তরিকভাবে যাকে 'গার্ডরেইলস' বা রক্ষাকবচ বলছে; যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির এ সময় তাইয়ান সফরে তা হুমকির মুখে। ১৯৯৭ সালের পর এটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চ পর্যায়ের কোনো সদস্যের তাইওয়ান সফর। এ সফরকে পেলোসির সমর্থকরা স্বাগত জানালেও চীনকে হতাশ করবে। আশা করা হচ্ছে, কয়েক মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কম্যুনিস্ট পার্টির পঞ্চবার্ষিক কংগ্রেসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনয়ন দিতে পারে। এমন সময় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ৯৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে।
ন্যান্সি পেলোসির আগে ১৯৯৭ সালে যখন নিউ গিংরিচ তাইওয়ান সফর করেন, তখনও চীনের দিক থেকে আপত্তি উঠেছিল। তবে বেইজিং সে উস্কানি একভাবে হজম করে নিয়েছিল। গিংরিচের সফরের আগে ১৯৯৬ সালে তাইওয়ান প্রণালি সংকটে পড়ে, যা কয়েক মাস স্থায়ী হয়। ২৬ বছর আগের সেই ঘটনার পর এখন চীন সামরিক শক্তিমত্তাসহ নানা দিক থেকে সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যদিও দেশটি এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পিছিয়ে। শি জিনপিংয়ের 'ন্যাশনাল রিজুভেনশন' বা জাতীয় পুনর্জাগরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বেইজিং তাইওয়ানের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের বিষয়টি ভাবছে। চীনের প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন উপলক্ষে শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণের কথা বলেছেন। চীন ও পশ্চিমাদের মধ্যে সম্পর্ক যেহেতু খারাপ হয়েছে; তাইওয়ান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় চীন ভালোভাবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর এটা আরও প্রবল। দুঃখজনকভাবে, বেইজিংয়ের নিজস্ব ভাষা কিংবা পদক্ষেপ এ উদ্বেগ দূর করবে বলে মনে হয় না। ন্যান্সি পেলোসি ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা তাঁর এক নিবন্ধে বলেছেন, চীন যখন তাইয়ানকে এবং দেশটির গণতন্ত্রকে হুমকি দিচ্ছে, তখন আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না। তবে এই সংশয় ও উত্তেজনার মধ্যে পেলোসির তাইওয়ান সফর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে স্থিতিশীলতা যেমন আনবে না, তেমনি আমেরিকার স্বার্থও হাসিল করবে না কিংবা তাইওয়ানের জনগণের নিরাপত্তাও বৃদ্ধি করবে না। এমনটিই বলেছেন উড্রো উইলসন সেন্টারের চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক কিসিঞ্জার ইনস্টিটিউটের পরিচালক রবার্ট ডালি।
বেইজিং মনে করে, পেলোসির সফর একটি 'উস্কানি', যেটি দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অবিশ্বাস তৈরি করবে। বিগত কয়েক দিনে বাইডেনের কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যকার পার্থক্য বড় করে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু চীনের বিশ্নেষকরা মনে হচ্ছে, হাউস স্পিকারের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের পদ একত্র করে ফেলেছেন। অথচ উভয়েরই আলাদা সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।
সোমবার চীনের মুখপাত্র হুঁশিয়ার করে বলেছেন, এ সফরের সময় তাঁর সামরিক বাহিনী 'অলস বসে থাকবে না'। এর কয়েক ঘণ্টা পর চীনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রশাসন ২ থেকে ৬ আগস্ট একটি মহড়ার কথা ঘোষণা করে। মঙ্গলবার পিপলস লিবারেশন আর্মি বৃহস্পতিবার অর্থাৎ পেলোসির তাইওয়ান ত্যাগের পরদিন থেকে সামরিক মহড়ার কথা ঘোষণা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই। মঙ্গলবার রয়টার্সের খবর অনুসারে, পরমাণু শক্তি সংবলিত রণতরী ইউএসএস রোনাল্ড রিগানসহ চারটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'রুটিন' মহড়া অনুযায়ী তাইওয়ানের পূর্বে মোতায়েন ছিল।
বিশ্নেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির এ সফরে যদি সামরিক মহড়া না হতো, তারপরও এ কথা বলা হতো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইংওয়েন প্রশাসনকে স্বাধীনতার ব্যাপারে সাহায্য করছে। বেইজিং দীর্ঘ দিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই-এর উদ্দেশ্যর ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করছে। সোমবার যখন জানা যায়, ব্রিটিশ এমপিদের এক প্রতিনিধি দলও এ বছরের শেষে তাইওয়ান সফর করবে, তখন সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক বনি গ্লেজার বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা ক্ষীণ। তবে চীন সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে যে শক্তি প্রদর্শন করছে, তা তাৎপর্যপূর্ণ। সম্ভবত তাইওয়ানকে শায়েস্তা করার সুযোগ চীন
বিভিন্নভাবে চাইছে।
বলাবাহুল্য, শাস্তি শুরু হয়ে গেছে এবং দৃশ্যত তা থেকে মুক্তি নেই। চীনের প্রশাসন রাতারাতি এক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, শতাধিক তাইওয়ানি খাদ্য কোম্পানি থেকে তারা আমদানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। সন্দেহ নেই, ন্যান্সি পেলোসির সফরের প্রতিশোধ হিসেবেই তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এ ঘোষণা দিয়েছে।
চীনের প্রতিক্রিয়ার জবাব তাইওয়ান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেবে, তা অস্পষ্ট। তবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির চীন সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক টড হল বলেছেন, আমার মূল দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, বেইজিং যেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তেমনি ওয়াশিংটনও বসে থাকবে না। ফলে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া উত্তেজনা বাড়াতে পারে। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তেজনা বাড়তে থাকলে সম্পর্ক আরও ভয়াবহ রূপে পৌঁছতে পারে। এর বিপরীতে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভালো হতে পারে যদি তারা উত্তেজনা বৃদ্ধি বা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার পরিবর্তে কৌশলগত স্থিতিশীলতা আনয়নে মনোযোগ দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যায়।
ভিনসেন্ট নি: গার্ডিয়ানের চীন বিষয়ক সংবাদদাতা; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক