সংগত কারণেই মার্কিন ডলারের মূল্যমান বরাবরই বাংলাদেশি টাকার চেয়ে বেশি। বস্তুত, বৈশ্বিকভাবেই প্রায় সব দেশের মুদ্রার মূল্যমান ডলারে সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে। ইউক্রেন সংকট শুরুর পর থেকে বৈদেশিক বিনিময়ের প্রধানতম মাধ্যম এই মুদ্রার দাম ও চাহিদা স্বাভাবিক কারণে আরও বেড়েছে। বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি, পরিস্থিতি সামাল দিতে গত এক বছরে ডলারের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বাড়াতে হয়েছে। দাপ্তরিকভাবে প্রতি ডলার যদিও সর্বশেষ ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে; অনানুষ্ঠানিক বাজারে এর দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। এখন বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় ডলার মিলছে না সহজে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ব্যাংকের তারল্যেও এ পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। বুধবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- মুদ্রাবাজারে চলমান ডলার সংকটে চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এর বিপরীতে যদিও ব্যাংকগুলো থেকে টাকা আসছে; দেশীয় মুদ্রার তারল্যে টান পড়ছে সেখানে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বৃত্ত তারল্যও কমে আসছে। অবশ্য জুলাই মাসে যেহেতু রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স বেড়েছে এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এলসি বা ঋণপত্র খোলার হার কমে গেছে; ডলার বাজারের পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।
ডলারের বাজারে জুলাই মাসের শেষে রুপালি আলোর রেখা দেখা গেলেও আঁধারের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে অন্যদিক থেকে। বুধবারের সমকালেই অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- 'ভিআইপি প্রটোকল' ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ডলার পাচার হচ্ছে। খোদ সরকারের একটি সংস্থার গোপন প্রতিবেদন উদ্ৃব্দত করে বলা হয়েছে- বিদেশ ভ্রমণের সময় তল্লাশি কার্যক্রমের শিথিলতার কারণে অনেক যাত্রী অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার করছেন বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষত 'ভিআইপি' যাত্রীরা বিমানবন্দরে প্রাপ্ত প্রাধিকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তল্লাশি এড়িয়ে ডলার পাচার করতে সক্ষম হচ্ছেন। আমরা মনে করি, এই অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। দেশের ডলারের মজুত ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে যখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে; সরকারি বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলারের লেনদেন সীমিত করা হচ্ছে; তখন খোদ বিমানবন্দর ব্যবহার করে ডলার পাচার বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো ছাড়া আর কী? এটা ঠিক, সাধারণ বিদেশযাত্রীরাও পর্যটন, চিকিৎসা ও শিক্ষা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষত ডলার দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। গত বছরের চার মাসে বিদেশগামী আট লাখের বেশি যাত্রী যদি ৫০০ ডলার করেও নিয়ে যান, তাহলে ওই সময়ে ৪০ কোটির বেশি ডলার বিদেশে যেতে পারে বৈকি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, 'পাচার' যেখানে মূল বিষয়, সেখানে ডলারের এই অঙ্ক নেহাত সামান্য। বস্তুত ডলার পাচার বন্ধ করা না গেলে সকলই গরল ভেল!
স্বীকার করতে হবে- ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ লেনদেনে লাগাম টানা যতটা সহজ; বৈদেশিক মুদ্রা পাচার বন্ধ করা ততটাই কঠিন। এ ক্ষেত্রে হুন্ডির কারণে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের বিষয়টিও ভাবতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। আমরা জানি, হুন্ডি এক বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বাইরেও প্রতিবেশী ও দূরবর্তী বিভিন্ন দেশে যখন ডলারের বাজার ও মজুত অস্থিতিশীল, তখন হুন্ডির বাড়বাড়ন্ত ঘটতেই পারে। এও ভুলে যাওয়া চলবে না- স্বাভাবিক সময়েও আমদানি ও রপ্তানিতে শুল্ক্ক ফাঁকি দিতে ডলার 'স্থানান্তর' করার এই অবৈধ পথ বেছে নেন অনেক 'সচেতন' উদ্যোক্তা। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা স্পষ্ট যে, বিমানবন্দর ছাড়াও সীমান্তের প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলোতে ডলার পাচার নিয়ে বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারি জরুরি। সীমান্ত চোরাচালান পথগুলোতেও প্রয়োজন কড়াকড়ি। আর সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো বিমানবন্দরে তল্লাশির ক্ষেত্রে অন্তত আপাতত 'ভিআইপি' সুবিধা রহিত করা। কাজটি সহজ নয়, আমরা জানি। কিন্তু কঠিনেরে ভালোবাসতেই হবে। বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য নিয়ে সার্বিক অর্থনীতি যখন সংকটের মুখে, তখন এ ক্ষেত্রে সামান্য ছাড় অসামান্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিষয় : ভিআইপি সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন