শেখ কামালকে প্রথম দেখি ঢাকা কলেজের এক অনুষ্ঠানে। ১৯৬৭ সালে প্রবেশিকা পাস করে সেখানে ভর্তি হয়েছি বিজ্ঞান বিভাগে। স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজের ছাত্র হওয়া বিরাট পরিবর্তন, স্বাধীন স্বাধীন ভাব। তবে ঢাকা কলেজে পড়াশোনার চাপ ছিল বেশ। তৎকালীন চারটি বোর্ডের সেরা ছাত্ররাই এই বিদ্যায়তনে ভর্তি হতো। ফলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা লেগেই থাকত। শিক্ষকরা চাইতেন কলেজের সুনাম যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।
দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ক্লাসে একদিন প্রিন্সিপালের নোটিশ পেলাম যে, পরের দিন সকালে সবাইকে কলেজ মিলনায়তনে সমবেত হতে হবে। পরের দিন আমরা সমবেত হয়ে অপেক্ষা করছি। এক পর্যায়ে একজন সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে প্রিন্সিপাল জালাল উদ্দিন আহমেদ মঞ্চে উপস্থিত হলেন। তখন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগের জন্য কলেজগুলোতে এমন সমাবেশ করা হতো। উদ্দেশ্য, সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা। এটা সাধারণত দ্বিতীয় বর্ষে করা হতো, যাতে আগ্রহীরা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের প্রস্তুতি নিতে পারে। ওই সময় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা হাতে গোনার মতো। বাঙালিদের ক্ষোভও ছিল- সামরিক বাহিনীতে তাদের সুযোগ দেওয়া হয় না।
সেই সমাবেশে সামরিক বাহিনীর মেজর সাহেব লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা শেষে শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন আহ্বান। আমার পেছনে বসা একজন তরুণ দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রথম প্রশ্নটি করলেন পরিস্কার ইংরেজিতে। জানতে চাইলেন- সেনাবাহিনীতে এত বৈষম্য কেন? কেন সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের কম নেওয়া হয়? সব শেষে বললেন- পাকিস্তানের স্বার্থান্বেষী মহল সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের নেবে না এবং এতক্ষণ যা হয়েছে তা প্রহসন মাত্র।
মেজর সাহেব স্বভাবতই এমন প্রশ্ন আশা করেননি। আমরাও প্রশ্ন শুনে রীতিমতো অবাক। কে এই সতীর্থ, যে প্রশ্ন করতে ভয় পায় না? মনে পড়ছে, প্রিন্সিপালও কিছুটা বিব্রত। সেনা কর্মকর্তা উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশ্নকর্তার পরিচয় জানতে চাইলেন। উত্তরে তিনি বললেন- নাম শেখ কামাল, পিতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। নাম শুনে মেজর বললেন- এমন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আপনার পক্ষেই করা সম্ভব। আমি অবাক বিস্ময়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি পাতলা লিকলিকে এক ছেলে সাদা শার্ট ও সাদা প্যান্ট পরিহিত, চোখে কালো
চশমা। মনে মনে তাঁর সাহসের প্রশংসা না করে পারলাম না।
কথাগুলো আমাদেরও অনেকেরই মনের কথা, কিন্তু বলার জন্য যে সাহস প্রয়োজন, তা তো ছিল না। সেদিনকার সভাটি যেন পণ্ডই হয়ে গেল। একজন কলেজছাত্র যে এমন প্রশ্ন করতে পারে, তা তাদের চিন্তার বাইরে ছিল। শেখ কামাল পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এমন সময়, যখন বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিল রুদ্ধ। আমরা যারা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তারাও সেই বৈষম্য নিয়ে ভাবতাম। সেই সময় যেসব ছাত্র আন্দোলন হতো, তাতে ঢাকা কলেজের ছেলেরা যোগ দিত। এর পুরোধা ছিলেন শেখ কামাল।
শেখ কামালের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আরও কিছুদিন পর। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে; সেখানে ছাত্র ইউনিয়ন আর ছাত্রলীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। একদিন শেখ কামাল তাঁর কিছু কর্মীসহ ক্লাসের সামনে এসে আমাকে খোঁজ করলেন। বেশ অবাক হয়েই তাঁর কাছে গেলাম। কিন্তু যে কথা শুনলাম, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। শেখ কামাল সরাসরি আমাকে ছাত্রলীগ থেকে ক্লাসের প্রতিনিধিত্ব করার প্রস্তাব দিলেন। আমি দ্বিধাগ্রস্ত, কারণ সাধারণত ভালো ও মেধাবী ছাত্ররাই তখন নির্বাচনে দাঁড়াত। এর আগের বছর ১৯৬৭ সালে আমাদের ক্লাস থেকে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী জিতেছে। কিন্তু কামাল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাকেই নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। যুক্তি দিলাম যে, আমি তেমন মেধাবী ছাত্র নই (প্রথম বিভাগ মাত্র), আর আমি কলেজ হোস্টেলেও থাকি না। সে সময় হোস্টেলে থাকা প্রার্থীদের বেশ সুবিধা ছিল। বেশিরভাগ হোস্টেলে বসবাসরত ছাত্র ভোটের সময় তাদেরই ভোট দিত। তবুও নির্বাচনে দাঁড়াতে হলো এবং কাকতালীয়ভাবে জিতেও গেলাম। ছাত্রলীগের প্রায় পুরো প্যানেলই জয়ী হলো।
ইন্টারমিডিয়েটের পর আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম; শেখ কামাল সমাজবিজ্ঞানে আর আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। কিন্তু ঢাকা কলেজের ঘনিষ্ঠতা বহাল রইল। তিনি ছিলেন খেলাপাগল- ফুটবল ও ক্রিকেট দুটোই খেলতেন। যতদূর মনে পড়ে, নিজের বিভাগের ক্রিকেট দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। খুব ভালো সেতারও বাজাতে পারতেন। আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নবীনবরণ অনুষ্ঠানেও তিনি দু'বার সেতার বাজিয়েছিলেন।
দেশে তখন আন্দোলন তুঙ্গে। স্বাধিকারের জন্য ছাত্র-জনতা এক হয়ে গেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আমরা সবাই একাট্টা। এর মাঝে স্বাধীনতা যুদ্ধ এসে গেল। শেখ কামালও স্বাধীনতা যুদ্ধে চলে গেলেন। স্বাধীনতার পর যখন আবার আমরা মিলিত হলাম, তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র। কিন্তু সহপাঠী ও বন্ধুদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের সামান্যতম পরিবর্তন নেই। মেজাজেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি; সর্বদাই সে হাসিখুশি এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আগ্রহী। তাঁর মধ্যে কোনো অহমিকা দেখিনি। দশটি সাধারণ ছেলের মতোই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন, ক্লাস করতেন। বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে খেলতে যেতেন বন্ধুদের সঙ্গে।
মনে পড়ে, ১৪ আগস্ট রাতেও বাসস অফিসে কাজ করেছিলাম। ভোরে এক সহকর্মী জানালেন, বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের সবাই সামরিক বাহিনীর সদস্যের হাতে নিহত হয়েছেন। ১৫ তারিখ বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা। শেখ কামাল শুনেছি সেই তদারকির কাজে অনেক রাত অবধি ক্যাম্পাসে ছিলেন। রাত বেশি হওয়ার জন্য বন্ধুরা তাঁকে বলেছিল ক্যাম্পাসে থেকে যেতে। কামাল তা করেননি, ঘরে তাঁর নববিবাহিত স্ত্রী। ক্যাম্পাস থেকে বাড়িতে ফিরে গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
মাঝে মাঝে ভাবি, শেখ কামাল যদি সেদিন বাড়ি না ফিরতেন, তবে তো বেঁচে যেতেন। মাত্র ২৫ বছরের জীবনে তার অগণিত ভক্ত ও বন্ধু আছেন, যাঁরা তাঁকে সবসময় স্মরণ করবেন। আজ তাঁর জন্মদিনে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের নিহত স্বজনদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
এম শফিকুল করিম সাবু: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার নয়াদিল্লি ব্যুরোর সাবেক প্রধান