মঙ্গলবার দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহনের একটি নৈশবাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, তা যে কোনো প্রেক্ষিতেই যথেষ্ট উদ্বেগজনক। একটি ব্যস্ত মহাসড়কে চলন্ত বাসে তিন ঘণ্টা তাণ্ডব চালিয়ে ডাকাত দলের অবলীলায় পালিয়ে যেতে পারা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট ও ধর্ষণের অঘটনের সময় মহাসড়ক নিরাপত্তায় নিয়োজিত 'হাইওয়ে পুলিশ' কোথায় ছিল- এই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। রাতে ও দিনে মহাসড়ক ধরে হাইওয়ে পুলিশের টহল দল থাকার কথা। আমরা মনে করি, সংশ্নিষ্টরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে ডাকাতির এই ঘটনা আলোচ্য মাত্রায় নাও ঘটতে পারত।
মনে রাখতে হবে- হাইওয়েতে এটাই প্রথম ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাসে ডাকাতির সঙ্গে নারী যাত্রী ধর্ষণের প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে তা অপরাধীদের বেপরোয়া মনোভাবই স্পষ্ট করে তোলে। আর অপরাধী তখনই বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শৈথিল্য দেখা যায়। আমাদের মনে আছে, ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি বগুড়া থেকে ঢাকার পথে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এলাকায় একটি বাসেও ডাকাতির পর এক তরুণী যাত্রী ধর্ষণের শিকার হন। আমরা মনে করি, এসব অঘটন কেবল জননিরাপত্তাই হুমকির মুখে ফেলবে না; নারীর অবাধ চলাচলকেও নিরুৎসাহিত করবে।
আমরা দেখেছি, গত জুন মাসে ঢাকার আশুলিয়ায় হানিফ পরিবহন ও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে স্টারলাইন পরিবহনের বাসে ডাকাতির ঘটনায় র‌্যাব আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। র‌্যাবের তথ্যমতে, ওই চক্রটি গত দেড় বছরে যাত্রীবেশে মহাসড়কে প্রায় দেড় ডজন ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত। সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইলসহ মহাসড়কের অন্যান্য রুটেও এমন চক্র কাজ করছে বলে আমাদের ধারণা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, পুলিশের গত জানুয়ারির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রাজধানীতে চুরি-ছিনতাই এবং যাত্রীবাহী পরিবহনে ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসে। এর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ থাকলেও ডাকাতির ঘটনা কেন কমছে না?
রাতে চলা বাসগুলোতে ডাকাতি ঠেকাতে বিশেষ প্রযুক্তি 'প্যানিক বাটন' চালুর বিষয়টি গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলেও তা চালু হয়নি। এ সেবাটির মাধ্যমে বাস ডাকাতির শিকার হলে এতে চাপ দিলেই বার্তা পৌঁছে যাবে জরুরি সেবা ৯৯৯; স্থানীয় থানা কিংবা পরিবহন মালিকের কাছে। আমরা মনে করি, যাত্রীর নিরাপত্তায় এমন প্রাযুক্তিক উদ্যোগ জরুরি এবং অনতিবিলম্বে তা চালু হোক।
বাসে ডাকাতি কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধ ঠেকাতে পরিবহন মালিক, চালক ও অন্য কর্মীদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বাসের কর্মীদের সহায়তায় ডাকাতির ঘটনার অভিযোগও কম নেই। যদিও মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় ঈগল পরিবহনের মালিক সহযোগী এক সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, ওই বাসের কর্মীরা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত। তিনি এটাও স্বীকার করেছেন, আসন খালি থাকলে পথে যাত্রী ওঠানো হয়। অথচ নৈশ বাসে যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলার অপচর্চা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ- ঈগল পরিবহনের অঘটনই তার প্রমাণ। যাত্রীর নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিটের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি।
মহাসড়কে কেবল টহল দেওয়াই নয়; বিশেষ করে রাতের নিশ্চিন্ত চলাচল নিশ্চিতে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও পরিবহনকর্মী ও মালিকদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন; দুর্ঘটনা কিংবা ডাকাতির কবলে পড়লে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে তাদের জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল মহাসড়কের মতো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে তাদের তৎপরতা বাড়াতেই হবে।
স্বস্তির বিষয়, ডাকাতির সঙ্গে জড়িত একজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার সমকাল অনলাইন খবর দিয়েছে। আমরা চাই, তার সঙ্গে অন্য অপরাধীদেরও যত দ্রুত সম্ভব আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। পাশাপাশি ডাকাতির সংঘবদ্ধ চক্রকে ধরতে প্রয়োজনীয় অভিযান চালানোর বিকল্প নেই। মহাসড়কে ডাকাতি ও ধর্ষণের এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চলতে দেওয়া যায় না।

বিষয় : সম্পাদকীয় যথেষ্ট উদ্বেগজনক

মন্তব্য করুন