মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির এ সময়ের তাইওয়ান সফর এতটাই উস্কানিমূলক, মনে হচ্ছে এর লক্ষ্য সামনের মধ্যবর্তী নির্বাচনে লোকের নজর কাড়ার চেয়েও কিছু বেশি। ন্যান্সি পেলোসি ঘোষণা করেছেন, 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এটা স্পষ্ট করতে হবে, আমরা স্বৈরশাসকদের কাছে হেরে যেতে পারি না।' চীনের অপ্রত্যাশিত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াও উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। জো বাইডেন যখন জোর দিচ্ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে, তখন প্রেসিডেন্টের দপ্তর 'কৌশলগত অস্পষ্টতা'র কথা বলে পিছুটান দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধে জড়াবে এমনটা কেউই বিশ্বাস করে না।
ইউক্রেনের ব্যাপারে রাশিয়ার প্রতি পশ্চিমাদের একই নীতি স্পষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ড বারবার বলে আসছে, রাশিয়া 'অবশ্যই পরাজিত হবে এবং তার লক্ষণ স্পষ্ট'। কিন্তু রাশিয়া কি ইউক্রেনে হামলা চালাতে বিরত ছিল? দৃশ্যত পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনকে সমানে সমান যুদ্ধ হবে বলে উস্কে দিয়েছিল। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা আমরা দেখেছি। কিন্তু ফলাফল কী?
একই অনিশ্চয়তা ১৯১৪ সালে ইউরোপীয় কূটনীতিকে বোকা বানিয়েছিল। জেনারেলরা যখন উদ্ধত হয়ে যান এবং বাহিনীর মধ্যে ভাঙন ধরান, তখন শাসকরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। তখন পতাকা উড়ছিল এবং সংবাদমাধ্যম অস্ত্রবিষয়ক সংবাদে পূর্ণ ছিল। আলোচনা তখন আলটিমেটামে পরিণত হয়।
শীতল যুদ্ধের সময়ে পূর্ব-পশ্চিমের দুটি পারমাণবিক সংকট দেখা যায়। ১৯৬২ সালে কিউবার ঘটনা এবং ১৯৮৩ সালে ভুয়া মিসাইল সংকেত বেজে ওঠাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যকার দুর্যোগ বরং যোগাযোগের অঘোষিত নিয়ামক হয়ে উঠেছিল। তখন তারা কাজ করেছিল। কিন্তু সেই যোগাযোগ এখন আর অবশিষ্ট নেই। এখন পূর্ব ব্লক দু'জন স্বৈরশাসক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যদিও তাঁরা অভ্যন্তরীণভাবে নিরাপদ, কিন্তু সীমান্তের বিষয়ে তাঁরা হুমকির সম্মুখীন।
পশ্চিমা বিশ্ব নানা কারণে দুর্বল এবং তাদের নেতারা বিভিন্নভাবে ব্যর্থ। যদিও তারা বিশ্বের সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী। পশ্চিমাদের পুরোনো সাম্রাজ্যবাদ এখন নতুন রূপে পশ্চিমা 'স্বার্থ ও মূল্যবোধ' হিসেবে আলোচনা হচ্ছে। অর্থাৎ তারা পশ্চিমা 'স্বার্থ ও মূল্যবোধ' রক্ষায় যে কোনো হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত। এ রকম হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে তারা কোনো সীমানা মানছে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি যাই বলুন, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সুবিধার্থেই স্বৈরশাসকদের কাছেই নত হবে। এবার তারা হস্তক্ষেপ করুক বা তা করতে ব্যর্থ হোক। কিংবা হস্তক্ষেপ বা এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, রুয়ান্ডা, ইয়েমেন, সৌদি আরব কিংবা অন্য দেশগুলোতে তাদের নীতি আমরা দেখছি। ব্রিটেন হংকংকে চীনের কাছে দিয়ে দিয়েছে এবং আফগানিস্তান তালেবানকে উপহার দিয়েছে। তাদের সর্বশেষ অনর্থক হস্তক্ষেপ দেখা গেছে গত সপ্তাহে, তারা আফগানিস্তানের কাবুলে থাকা আল কায়দার নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরিকে হত্যা করেছে। পশ্চিমারা তাদের 'স্বার্থ ও মূল্যবোধের জন্য' হাজারো বিদেশিকে হত্যা করেছে।
বর্তমানে যখন পূর্ব-পশ্চিমের সম্পর্কের দ্বন্দ্বে ভয়াবহ হুমকি তৈরি হয়েছে, এ সময়ে আমরা অন্তত আশা করতে পারি, ব্রিটেনের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রুজ তাঁর নির্দিষ্ট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ব্রিটেনের স্বার্থে ইউক্রেন কিংবা তাইওয়ানকে দেখা।
রাশিয়া ও চীন উভয়েরই সীমান্ত দ্বন্দ্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বলা বাহুল্য, সীমান্ত নিয়ে সংঘাত বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ঘটে থাকে। বহিরাগতরা তা সমাধানে খুব কমই সহযোগিতা করে থাকে। সেই দিন এখন আর নেই যখন চীন, রাশিয়া কিংবা অন্য দেশের স্বার্থের বিষয়ে পশ্চিমারা নাক গলাতে পারত। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চীন কিংবা রাশিয়া কেউই বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে সেই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেনি। তবে তারা তাদের সাবেক প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে মাত্র।
ইউক্রেন এবং তাইওয়ানের ভাগ্য যাতে ভালো হয়, সেটা প্রত্যেক কূটনীতিকই চাইবেন, কিন্তু তাঁরা এ দুই দেশের মাধ্যমে বিশ্বযুদ্ধ কিংবা পারমাণবিক ধ্বংসলীলা চান না। তবে সংঘাত একদিন বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এখন উভয় পক্ষই দুর্যোগ নিয়ে খেলছে। এখন পশ্চিমাদের উচিত এই খেলা থেকে পিছু হটা। ইউক্রেন কিংবা তাইওয়ান প্রশ্নে আত্মঘাতী অবস্থান থেকে ফিরে আসা। আর বলা, এটা পরাজয় নয়।
সাইমন জেনকিনস :গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক