'হাতে এক কাপ চা ধরাইয়া দিয়া একটা রুমের মধ্যে আটকাইয়া রাহেন। লগে কয়ডা কাগজ দিয়া দিয়েন'- বলেই হাতের মুঠোয় তর্জনী ও মধ্যমার মাঝে ধরা সিগারেটে বড় করে সুখটান দেন তিনি। 'ল্যাহা শ্যাষ করলে ছাইড়া দিয়েন'- ওপরের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির ধোঁয়া ছাড়েন। 'ল্যাহা সুড় সুড় কইরা বাইরাইয়া আইবো'- বিড় বিড় করে কথা শেষ করেন তিনি।
আমি হতবাক। লিখিয়ে নেওয়ার এমন একটা পন্থা যে কেউ বাতলাতে পারেন, বিশ্বাসই হয় না। বিশেষত সন্তোষদার মতো মানুষ সংবাদের প্রখ্যাত সহকারী সম্পাদক সন্তোষ গুপ্ত। কম অবাক হননি হাসনাত ভাইও- সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর নন্দিত সম্পাদক আবুল হাসনাত, যিনি মাহমুদ আল জামান নামে কবিতা লিখতেন ষাটের দশকে আর 'কালি ও কলম'-এর সম্পাদনা করেছেন।
আমার থ হয়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে লেখা আদায়ের জন্য আমাকেই বন্দি করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন হাসনাত ভাইকে উদারচিত্তের বামপন্থি চিন্তাবিদ সন্তোষ গুপ্ত।
আশির দশকের মধ্য-সময় তখন। সংবাদের প্রতি বিকল্প বৃহস্পতিবারের সাহিত্য সাময়িকীতে সমাজ-রাষ্ট্র-অর্থনীতিবিষয়ক আমার কলাম 'কড়ি-কড়চা' বের হয়। তার আগেও সংবাদে লিখতাম- নিয়মিত নয়, অনিয়মিতভাবে। হাসনাত ভাই আর মফিদুল ভাইয়ের 'সাহিত্য প্রকাশের' স্বত্বাধিকারী ও আমার বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রকাশক মফিদুল হকের অনুরোধ ও উস্কানিতেই 'কড়ি-কড়চা' লিখতে শুরু করেছিলাম। কয়েকদিন পরই অবশ্য বুঝেছিলাম,
নিয়মের কী গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়েছি আমি।
সেদিন আমি বসে আছি হাসনাত ভাইয়ের সামনের চেয়ারে একটু কৌণিকভাবে। এমনকি দোষ আমার যাতে সন্তোষদা অমন একটা চরম দণ্ডের কথা বললেন? মানি, 'কড়ি-কড়চার' জন্য সোমবারেই আমার লেখা দেওয়ার কথা। অত নিয়ম কি মানা যায়? অন্য কাজ আছে না? সেই কথাটাই তো হাসনাত ভাইকে বলতে এসেছিলাম যে, এ সপ্তাহে লেখাটা দিতে পারব না। আর এত ছোট্ট একটা কথার পিঠে কিনা সন্তোষদা অমন একটা গুরুদণ্ডের কথা বললেন! অবশ্য এর আগেও এ রকমটা আমি করেছি বেশ কয়েকবার। সময়মতো লেখা না দিয়ে হাসনাত ভাইকে বিপদে ফেলেছি। কিন্তু কখনও তাঁকে জিজ্ঞেস করিনি কেমন করে তিনি সামাল দিয়েছেন।
পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো সংবাদের স্বত্বাধিকারী আহমদুল কবির সাহেবের ঘরে এক তাড়া নিউজপ্রিন্ট আর এক পেয়ালা গরম চা-সহ। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে আস্তে করে পেছনের দরজা ভেজিয়ে দিলেন মান্নান- সংবাদের অন্যতম সহায়ক ব্যক্তি। টের পেলাম জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে মুখে কৌতুকের হাসিসহ সোহরাব, মঞ্জুর আর কামরুলের মতো সংবাদের অনুজপ্রতিম তরুণ সাংবাদিকরা।
গত্যন্তর নেই। লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ডুবে গেলাম লেখায়, ভুলে গেলাম চারপাশ। মাথার চুলের গোছায় আঙুল চলছে আর চলছে কলম। খেয়ালই করলাম না, কখন মান্নান দ্বিতীয় কাপ চা রেখে গেছে। ঘণ্টাখানেক পরে যখন বের হলাম তখন সে সপ্তাহের 'কড়ি-কড়চা'র তরতাজা লেখা আমার হাতে। তুলে দিলাম তা হাসনাত ভাইয়ের হাতে লাজুক মুখে। বুঝলাম অতি সজ্জন হাসনাত ভাই এ চরম ব্যবস্থায় বেশ বিব্রত হয়েছেন।
আসন ছেড়ে হাসি হাসি মুখে হাসনাত ভাইয়ের টেবিলের দিকে এগিয়ে এলেন বজলু ভাই। আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, 'মনজুরের মতো (ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) সময়মতো লেখা দিলেই তো আর কোনো সমস্যা হয় না।' আমার কলাম যে সপ্তাহে বের হয়, তার অন্য সপ্তাহে বের হয় মনজুর ভাইয়ের সাহিত্য-বিষয়ক কলাম 'অলস দিনের হাওয়া'। কাঁটায় কাঁটায় লেখা নিয়ে আসেন তিনি। বোঝাতে পারি না কাউকে যে মনজুর ভাই দায়িত্ববান নিয়মানুবর্তী মানুষ- তাঁর মতো হওয়া আমার কম্মো নয়।
কিন্তু সন্তোষদার ওপরে আমার রাগ তখনও পড়েনি। তাকাই না সরাসরি তাঁর দিকে। কিন্তু সন্তোষদার সেদিকে বিকার নেই। 'ঠিক মতো ল্যাখা দ্যান না ক্যান?' জিজ্ঞেস করেন সন্তোষদা। 'সময় পাই না', নীরস গলায় বলি আমি। 'সময় পাওয়া যায় না, সময় বাইর কইরা নিতে হয়'। সন্তোষদার সে অমোঘ কথা ভুলিনি। বলেছি আমাদের কন্যাদের, আমার শিক্ষার্থীদের। নিজেও মেনে চলেছি সারাজীবন। আসলেই জীবনে সব কিছুর জন্য সময় বের করে নিতে হয়- সময়রা আপনা আপনি ধরা দেয় না।
আমার সম্পাদকরা- হাসনাত ভাই কিংবা সন্তোষদা আমাকে শুধু তাড়া দেননি, আমাকে ছায়াও দিয়েছেন। আশ্বাসের ছায়া, উদ্দীপনার ছায়া, আশার ছায়া। কিন্তু এমন ছায়া দেওয়ার মানুষের সংখ্যাও তো কমে আসছে আমার জীবনে। সন্তোষদা ও হাসনাত ভাই দু'জনেই আজ প্রয়াত। বছর কয়েক আগে ঢাকায় গিয়ে আনিস স্যারের (অধ্যাপক আনিসুজ্জামান) সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এমনই অনুযোগ করেছিলাম আমি। তিনিও আর নেই। হাতের বইটা টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে তিনি পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর মৃদুস্বরে বলেছিলেন, 'তোমার আর ছায়ার প্রয়োজন নেই। তুমিই এখন অন্যকে ছায়া দেবে।'
ড. সেলিম জাহান : অর্থনীতিবিদ ও লেখক