ভাষাসংগ্রামী, লেখক ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক ছয় দশক ধরে রবীন্দ্রচর্চায় নিয়োজিত। দেশীয় ওষুধ কোম্পানি ওরিয়ন ল্যাবরেটরিজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এই চিকিৎসক ১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৮৯ সালে ঢাকায় 'রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্ট' প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি 'রবীন্দ্রচর্চা' পত্রিকার সম্পাদক এবং ২০টির বেশি রবীন্দ্রবিষয়ক বই রচনা করেছেন। ১৯৯৫ সালে 'একুশে পদক' ছাড়াও ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির 'রবীন্দ্র পুরস্কার' লাভ করেন। রবীন্দ্রচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাঁকে 'রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য' উপাধি প্রদান করে। আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়।
সমকাল: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮২তম প্রয়াণ দিবস সামনে রেখে আমরা কথা বলছি। শুরুতেই আপনার কাছে জানতে চাইব মৃত্যুর এত বছর পরও রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক?
আহমদ রফিক: এই যে রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলছি, এটাও তো রবীন্দ্রনাথের কাছেই আমাদের ফিরে আসা। রবীন্দ্রনাথেরই প্রাসঙ্গিকতা। গ্রামের কৃষি ও কৃষকের জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব চিন্তা ছিল। জমিদার রবীন্দ্রনাথকে আমরা কম জানি। অনেকে না জেনেই নানা নেতিবাচক কথা বলেছেন। এখন যখন প্রজাবৎসল রবীন্দ্রনাথের সন্ধান আমরা পাই, তখন আর সমালোচনা করার সুযোগ নেই। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সমাজচিন্তা ও শিক্ষাচিন্তা এখনও সমান আধুনিক। আমরা যে বাংলা ভাষায় কথা বলি, সেই বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধিতেও রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অনন্য।
সমকাল: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে সম্মানের আসনে বসিয়েছেন নোবেল পাওয়ার মাধ্যমে। বাংলা ভাষায় আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে সেই আন্দোলনের আপনিও সামনের সারির একজন। সেই লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে?
আহমদ রফিক: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের যে লক্ষ্য তা অর্জিত হয়নি। বায়ান্নর যে চেতনা তা পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি ষাটের দশকের ছয় দফা ও একাত্তরে বাঙালিদের মুক্তি সংগ্রামে। সবাই একটি কথা বলেন, অনেকেই স্বীকার করেন ভাষা আন্দোলন সব আন্দোলনের সূতিকাগার। তাই বায়ান্নকে সব আন্দোলন-সংগ্রাম ও দাবি আদায়ের প্রেরণা মনে করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সংবিধান করলেন। সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য একটি সেক্যুলার সংবিধান করেছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরেই দুই জেনারেল এসে সেটি ছিন্ন ভিন্ন করলেন। সমাজতন্ত্রকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। যে সংবিধান দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা পেয়েছিলাম, সেটি বদলে ফেলা হলো। এভাবে ধীরে ধীরে দেশ ভাষা আন্দোলনের যে লক্ষ্য ছিল, সেখান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সমকাল: রবীন্দ্রনাথ তো মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্যও ছিল তাই। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা সব জায়গায় মাধ্যম হিসেবে বাংলার কথা বলা হয়েছিল। উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশে তা আর হলো কই! আমরা তো খুব গর্ব করে বলি, ভাষিক জাতি রাষ্ট্র। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন না করে আমরা কি তার দাবি করতে পারি?
সমকাল: মাতৃভাষার মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী করার কথাও তো রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন।
আহমদ রফিক: আমরা যদি ইউরোপের দেশগুলোর দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব, তারা প্রায় প্রত্যেকেই ভাষিক জাতি রাষ্ট্র। যেমন স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে স্পেনের অধিবাসীরা। আবার একইভাবে ইংরেজিতে কথা বলে ইংরেজরা। জাপানিরা বলে জাপানিজ ভাষায়। এখন আমরা যদি নিজ দেশেও বাংলাকে সর্বত্র ব্যবহার করতে না পারি, তবে আমরা বাঙালি দাবি করি কী করে? ভাষা আন্দোলনের যে দাবিগুলো ছিল, তা পুরোপুরি পালন হয়নি। সেগুলো হওয়া উচিত। দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে রবীন্দ্রচর্চা থাকলে মাতৃভাষার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে জাতিকে শক্তিশালী করার এই দিকটির কথা যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তা মনে রাখতেন তাঁরা।
সমকাল: আপনি রবীন্দ্রনাথকে নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন। কোন বইটির কাছে বারবার ফিরে আসেন?
আহমদ রফিক: রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র বারবার পড়তে ভালো লাগে। প্রতিবার পাঠেই আলাদাভাবে হাজির হয়। ছিন্নপত্রের ভাষা, বিষয় ও প্রকৃতির বর্ণনা সবই ভালো লাগে। এটি পড়ার সময়ে যেন প্রকৃতির কোমল স্পর্শ পাওয়া যায়। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের বাইরে ছিন্নপত্র তাই আমার বেশি পড়া হয়েছে। এখানে এক ভিন্ন রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়। এই রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন রোজকার রবীন্দ্রনাথ, যিনি কিনা পরিবার, সমাজ, দেশ ও সাহিত্য নিয়ে একইসঙ্গে জীবন পরিভ্রমণ করেছেন। ছিন্নপত্রের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অন্য রবীন্দ্রনাথের তাই তুলনা চলে না।
সমকাল: রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের প্রায় পুরোটা আসলে পূর্ব বাংলায় বসে রচিত। রবীন্দ্রসাহিত্যে পূর্ব বাংলার অবদান কতটা?
আহমদ রফিক: ঠিকই বলেছেন, ছিন্নপত্রে তাকালে পূর্ব বাংলাই দেখা যায়। পূর্ব বাংলা বিশেষত পতিসর শুধু জমিদারি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ক্ষেত্রই নয়, ছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা। এখানে তিনি রচনা করেন- দুর্লভ জন্ম, আমাদের ছোট নদী, পল্লীগ্রাম, সামান্য লোক, খেয়া, বন, তপোবনসহ আরও কিছু কবিতা। গানের কথা যদি বলি, বিখ্যাত গান বিধি ডগার আঁখি, বন্ধু মিছে রাগ করো না, জলে-ডোবা চিকন শ্যামল, আমি কান পেতে রইসহ আরও কিছু গান। ছোটগল্প প্রতিহিংসা, ঠাকুরদা, কাদম্বরী এখানেই রচিত। আবার 'গোরা' ও 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসের অংশবিশেষ পতিসরে রচিত। কিছুসংখ্যক প্রবন্ধও পতিসরে বসেই রচিত।
সমকাল: পূর্ববঙ্গের সমাজ কীভাবে মূল্যায়িত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে?
আহমদ রফিক: রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার মাটি ও মানুষকে অত্যন্ত আপন মনে করে ভালোবেসে ছিলেন। পতিসর থেকে ১৮৯৪ সালে ইন্দিরা দেবীকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- 'এখানকার প্রজাদের ওপর বাস্তবিক মনের স্নেহ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে- এদের কোনো রকম কষ্ট দিতে আদপে ইচ্ছা করে না। এদের সরল ছেলেমানুষের মতো অকৃত্রিম স্নেহের আবদার শুনলে বাস্তবিক মনটা আর্দ্র হয়ে ওঠে। যখন তুমি বলতে বলতে তুই বলে ওঠে, যখন আমাকে ধমকায়, তখন ভারি মিষ্টি লাগে। এক এক সময় আমি ওদের কথা শুনে হাসি, তাই দেখে ওরাও হাসে।' পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ও মুসলিম উভয় শ্রেণির প্রজাদের কাছ থেকে দেখেছেন। পূর্ববঙ্গের অসাম্প্রদায়িকতায় তিনি মুগ্ধ ছিলেন। এখানকার অসাম্প্রদায়িক সমাজের ছবি তাই রবীন্দ্র সাহিত্যে দেখা যায়।
সমকাল: রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গে যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ দেখেছিলেন, তা এখনও আছে?
আহমদ রফিক: অতীতের তুলনায় আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা বেড়েছে। কেবল আমাদের দেশের কথাই বা বলি কেন! উপমহাদেশেই বেড়েছে বলা যায়। আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরে শারদীয় দুর্গাপূজার সময় যেসব ঘটনা ঘটানো হলো, তা থেকেই বোঝা যায় আমাদের দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িকতার মর্ম যথাযথ উপলব্ধি করতে পারেনি। সত্যি বলতে, সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। অখণ্ড ভারত এবং অখণ্ড বঙ্গে এই সাম্প্রদায়িকতা স্থিত ছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সেখানে বিকশিত হয়ে উঠেছিল। ফলে ভারত বিভাগ, বঙ্গ বিভাগ, পাঞ্জাব বিভাগ- এসবই রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ। সেই উত্তরাধিকার আমরা বহন করে চলেছি। সে কারণেই পীড়াদায়ক ঘটনাগুলো ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সহায় হতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে-কবিতায়-গল্পে অসাম্প্রদায়িক বাংলার কথা বলেছেন। মানুষের পরিচয় মানুষ- এই কথাটিই তিনি বলতে চেয়েছেন।
সমকাল: আমরা জানি, আপনার একক উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় রবীন্দ্র গবেষণা ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন। ট্রাস্টটি কীভাবে পরিচালিত হয়? কারা এর সুবিধাভোগী?
আহমদ রফিক: শিক্ষার্থীরা এই ট্রাস্টের ফান্ড থেকে টাকা পায়। রবীন্দ্রনাথের ওপর যাঁরা পিএইচডি করছেন, তাঁদের ৫০ হাজার টাকা সাহায্য দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে অনেকে এখান থেকে সহায়তা পেয়েছেন। এটি পরিচালনার জন্য একটা কমিটি আছে। আমি কমিটির প্রধান। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল। এখন পরিসর বাড়িয়ে বাংলা বিভাগ ছাড়াও ইংরেজি বিভাগকে যুক্ত করে এটি পরিচালনা করা হয়।
সমকাল: গত প্রায় ছয় দশকের মতো সময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করেছেন। এসব কাজে কোনো অতৃপ্তি রয়েছে?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, সময়ের বিবেচনায় অনেকদিন ধরে কাজ করেছি এটা সত্যি। সর্বশেষ রবীন্দ্রজীবনী রচনার কাজ শুরু করেছিলাম বাংলা একাডেমির অর্থায়নে ও উদ্যোগে। এরই মধ্যে চার খণ্ড প্রকাশ হয়েছে। দুই খণ্ডের লেখক প্রয়াত আবদুশ শাকুর। দুই খণ্ড আমার। আরও একটি খণ্ড এখনও শেষ করতে পারিনি। এটাই শেষ খণ্ড। মাঝে করোনা মহামারির কারণেও এটা পিছিয়ে পড়েছে। আবার আমার শরীরের অবস্থা এতই নাজুক, কাজে হাত দেওয়ার শক্তি নেই। লেখার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ করতে পারছি না। সামনে যে পারব এমন কথা জোর দিয়ে বলতেও পারি না। তাই এটা একটা আক্ষেপ থেকে যাবে।
সমকাল: এখন আপনার দিন কাটে কীভাবে?
আহমদ রফিক: এখন নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা নিয়ে আছি। এরই মধ্যে কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। এখন বই পড়তে পারি না। চোখে সমস্যা। মাথা ধরে আসে। এখন দিনের অধিকাংশ সময় শুয়ে কাটাতে হয়। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতেও ভালো লাগে না। এটা বার্ধক্যজনিত কারণে হয়েছে বলে ধারণা। একটা সময়ে ভাবতাম রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি আয়ু পাব। সেটা এখন পেয়েছি সত্যি; কিন্তু না পাওয়া ভালো ছিল বলে মনে হয়।
সমকাল: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আহমদ রফিক: সমকালকে ধন্যবাদ ও শুভকামনা।