বেশ কয়েক মাস ধরে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটকে সামনে রেখে বাংলাদেশেও অনুরূপ সংকটের আশঙ্কা করেছেন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের একটা অংশ। শ্রীলঙ্কান সরকার মে মাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না মর্মে ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশেও একটা গোষ্ঠী প্রচার করে বেড়াচ্ছে- মেগা প্রকল্পগুলো বিদেশি সাহায্যে করা হয়েছে বিধায় এ দেশেও ঋণ সংকট অবশ্যম্ভাবী। বিদেশি ঋণ নিয়ে একটি দেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে কিনা, তা বিচার করা হয় ঋণ-জিডিপি অনুপাত দিয়ে। সাধারণত উচ্চ ঋণ-জিডিপি অনুপাত একটি দেশের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত এবং খেলাপি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে। কোনো বাঁধাধরা নিয়ম না থাকলেও সচরাচর উন্নত, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর জন্য ঋণ-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ৬০ ও ৪০ শতাংশ হলো বিবেচনাপূর্ণ সীমা। তবে এই সীমা অতিক্রম করলে তা আবশ্যিকভাবে গভীর সংকট নির্দেশ করে না। যেমন জাপান ২০০ শতাংশের বেশি ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়ে উন্নত দেশ আর আফগানিস্তান ৬ শতাংশের কম ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়েও স্বল্পোন্নত দেশ। ঋণ সংকট মূলত নির্ভর করে ঋণের শর্ত ও ব্যবহারের ওপর।
ট্রেডিং ইকোনমিকস ডট কমের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭১ শতাংশ; যা ২০২১ সালে এসে দাঁড়ায় ১১০ শতাংশে। বাংলাদেশে এই সময়কালে এ অনুপাত ৩০-৩১ শতাংশে উন্নীত হয়। ভারত ও পাকিস্তানে এই অনুপাত ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল নাগাদ ৬০-৭০ শতাংশের খানিকটা ওপরে পৌঁছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশে এই অনুপাত স্থিতিশীল এবং বাংলাদেশের গড় অনুপাত ভারতের চেয়ে অনেক কম।
কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, বাংলাদেশের জিডিপির হিসাবকে বেশি করে দেখানো হয় বলে এ দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত কম। বস্তুত, বাংলাদেশের মতো উন্নয়ন দেশের ছায়া অর্থনীতির পরিমাণ যদি সুশাসনের মাধ্যমে কমানো যেত, জিডিপির প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতো। বাংলাদেশে আজ থেকে ১০ বছর আগেও যেভাবে জিডিপি পরিমাপ করা হতো, এখনও সেভাবেই করা হয়। ঋণ-জিডিপি অনুপাত দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্বল দিক যখন প্রকাশ করা যাচ্ছে না, তখন বলা হচ্ছে- পাঁচ বছর আগের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু ঋণ নিয়ে সরকার উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করেছে বিধায় এ সময়েই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল এবং নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।
সাধারণত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি যেমন- ফিচ, মুডি'স, অ্যাসঅ্যান্ডপি কর্তৃক লেটারভিত্তিক রেটিং দিয়ে কোনো দেশের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা বিচার করা হয়। এজেন্সিগুলো পজিটিভ, স্টেবল ও নেগেটিভ- তিন ধরনের আউটলুক প্রকাশ করে। বাংলাদেশের আউটলুক ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর স্টেবল। শ্রীলঙ্কার আউটলুক দু-একবার পজিটিভ, স্টেবলসহ বেশিরভাগ সময় নেগেটিভ থেকেছে এবং ২০২২ সালে এসে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ঋণখেলাপি হয়েছে। পাকিস্তানের আউটলুকও ২০২২ সালসহ অতীতের বিভিন্ন বছরে নেগেটিভ। ২০২০ সালে ভারতের আউটলুকও নেগেটিভ ছিল। কিন্তু এই আউটলুক বাংলাদেশে কখনোই নেগেটিভ ছিল না। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস সবচেয়ে ভালো।
করোনাকালে বিশ্বের ৯০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে কভিড-১৯ আর্থিক সহায়তা ও ঋণসেবা ত্রাণের আওতায় ঋণ নিয়েছে। এটা মূলত করোনা ভ্যাকসিন কেনার জন্য। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ যে ঋণের আবেদন করেছে, তা প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসৃষ্ট চলমান অনিশ্চিত বৈশ্বিক অবস্থাকে সামনে রেখে সতর্কতামূলক চাহিদার অংশ হিসেবে। একে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে খবর বেরিয়েছে- দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে। শ্রীলঙ্কা তার রিজার্ভ প্রায় শূন্য ও নিজেকে খেলাপি ঘোষণা করে আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। পাকিস্তান রিজার্ভের পরিমাণ ধারাবাহিক ও আতঙ্কজনকভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ঋণের আবেদন করেছে। দেশ তিনটির রিজার্ভ পরিস্থিতি সিইআইসিডেটা ডট কমের তথ্যের আলোকে দেখা যাক। ২০১৯ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, যা জুলাই ২০২১-এ ১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়ে ২০২২ সালে কমতে কমতে মে মাসে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও কম ছিল এবং এই পরিমাণ রিজার্ভ দিয়ে মাত্র ১ দশমিক ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারবে। ২০১৯ সালে অক্টোবরে শ্রীলঙ্কার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০২০-এ কোনো এক মাসে ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও তার পর থেকে খুব দ্রুত ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং দেশটির রিজার্ভ জুন, ২০২২-এ মাত্র ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে; যা দিয়ে কেবল ১ দশমিক ২ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। পক্ষান্তরে, অক্টোবর ২০১৯-এ বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল সে সময়ের রেকর্ড ৩০ বিলিয়ন ডলার; যা করোনাকালে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে বাড়তে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে জুন ২০২২-এ ৩৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে মূলত আমদানি পণ্যের দাম বাড়ার কারণে। বাংলাদেশের রিজার্ভ করোনাপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে এখনও অনেক বেশি এবং বাংলাদেশ এখনও তার রিজার্ভ দিয়ে ৫ দশমিক ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম।
বাংলাদেশের স্থিতিশীল ক্রেডিট রেটিং এবং সংকট প্রশমনে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার আলোকে এটি বলা অসমীচীন নয়, দেশটির ঋণ সংকটে পতিত হওয়ার আশঙ্কা আপাতত ক্ষীণ। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার ঠিক পরই গত ২৮ জুলাই নিউইয়র্কভিত্তিক খ্যাতিমান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি'সের ভাষ্য হলো- 'বাংলাদেশের ওপর ঋণের চাপ বাড়লেও ঋণ সংকটের ঝুঁকি কম।' উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বেইলআউট চায়নি, এটি অপপ্রচার। সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান/ সংস্থা/ রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে পতনের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য বেইলআউট দেওয়া/ চাওয়া হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এখনকার প্রকাশিত খবর পদ্মা সেতু ঋণ চুক্তি বাতিল হওয়ার পরে তাঁদের ব্যর্থ/ অপ্রমাণিত মন্তব্যগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ড. আবদুর রশিদ সরকার :অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
rashid_econ@ru.ac.bd