সম্প্রতি স্বনামধন্য কয়েক ব্যক্তি প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন কোচিংকে উৎসাহিত করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, কোচিং এখন অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের সহায়ক ভূমিকা পালন করার বদলে প্রায় সমান্তরাল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা আরও বলেছেন, এতে অভিভাবকদের ওপর যেমন অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ এবং প্রকৃত শিক্ষা অপসারিত হয়ে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাটাই প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। মোট কথা, বাড়তে বাড়তে বাংলাদেশের কোচিং ব্যবসা এখন আকারে-প্রকারে বিরাটকায় দৈত্যের রূপ নিয়ে মূলধারার শিক্ষা ধ্বংসে উদ্যত। বিজ্ঞজনের কথা হলো, এমতাবস্থায় শিক্ষা আইনে কোচিং ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়ার অর্থ, অনেকটা নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো আত্মঘাতী হওয়া।

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী চাইলে সে এমন যে কোনো জায়গায় গিয়ে কোচিং করতে পারবে, যেখানে তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পড়ান না। শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করার যে অভিযোগ প্রায়ই ওঠে, সেটা মাথায় রেখেই এ ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞজন বলছেন, এটা যথেষ্ট নয়। তাঁরা বলছেন, যারা স্বেচ্ছায় কোচিংয়ে যায়, তারাও তো প্রকৃত শিক্ষা পায় না। কোচিং তো সেই আলাদিনের দৈত্যের মতো। মুদ্রার ঘর্ষণ হলেই হয়। তার কাছে যা চাইবেন, মুহূর্তের মধ্যে সে তা নিয়ে হাজির হবে- পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন, তার উত্তর। তারপর সেই উত্তর মুখস্থ করে তা লেখার চর্চা ইত্যাদি। চেরাগের মালিককে যেমন চেরাগ ঘষে তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ ছাড়া কৌটা নাড়তে হয় না; এখানেও তেমন, কড়িটি ফেলে এবং তৈরি করা উত্তর গলাধঃকরণ করে তা উগরে দেওয়া ছাড়া শিক্ষার্থীর আর তেমন কিছু করার থাকে না। এখানেই বিজ্ঞজনের আপত্তি।

এটা ঠিক, শিক্ষা আইনে কোচিং বন্ধ করার কথা না বলা মানে এটা স্বীকার করে নেওয়া- শিক্ষকরা অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না। তবে পৃথিবীর অনেক দেশের বেশিরভাগ স্কুলের শিক্ষকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষায় তার স্কুল ও শিক্ষকের ভূমিকা আসলে কতটুকু, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, স্কুল ও শিক্ষকের ভূমিকা এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। তবে যা বাকি থাকে তার জন্য যে শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে যেতেই হবে, তা নয়। সে নিজে চেষ্টা করেও তা অর্জন করতে পারে। আমাদের এখানে সেই স্বশিক্ষার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি বলে শিক্ষার্থীরা তাদের শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কোচিং সেন্টারগুলোর ওপর নির্ভর করে। আগে স্বশিক্ষার সংস্কৃতি তৈরি না করে এই ঘাটতি পোষানোর পথটি বন্ধ করে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলেই হয়তো শিক্ষা আইনে সব ধরনের কোচিং বন্ধ করার কথা বলা হয়নি।

তার অর্থ, আইন করে এই মুহূর্তে কোচিং সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ সমস্যা সমাধানের প্রধান উপায় হচ্ছে স্বশিক্ষার সংস্কৃতি তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলা। আসলে সব শিক্ষার্থী অপার কৌতূহল নিয়েই শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু পৃথিবীর তিনশ বছরের পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থাটা এমন, সেখানে তাদের আরও কৌতূহলী করে তোলা তো হয়ই না; উল্টো তাদের সহজাত কৌতূহলও দমিয়ে নির্জীব করে রাখা হয়। আশার কথা হচ্ছে, এই সমস্যাটা মাথায় রেখেই নতুন শিক্ষাক্রম প্রণীত হচ্ছে। শিক্ষাক্রমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের চারপাশের বিষয় সম্পর্কে এমনভাবে কৌতূহলী করে তোলা, যেন তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং নিজেরাই সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। সেই উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই যেন তৈরি হয় আরও প্রশ্ন এবং চিহ্নিত হয় আরও সমস্যা। নিজে নিজে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন করা, তার উত্তর খোঁজা, সমস্যা বোঝা এবং তার সমাধান করার চেষ্টা করাই হলো শিক্ষা।

এবার অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, এতে কী আর লাভ হলো! এ তো যেই লাউ সেই কদু। কোচিং দৈত্য তো আবার সেই প্রশ্ন ও তার উত্তর এবং সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু এবার যেহেতু শুধু পরীক্ষার খাতায় লিখে পাস করার সুযোগ থাকছে না, ফলে কোচিংয়ে তৈরি করা উত্তর আর তেমন কাজে লাগবে না। এখানে শিক্ষক লক্ষ্য করবেন তাঁর শিক্ষার্থীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেড়েছে কিনা; কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছে কিনা; সে সেই কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করছে কিনা এবং সেই চেষ্টা করতে করতে তার মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে কিনা। এগুলোর ওপর যে আবার সব সময় নম্বর থাকবে, তা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষার্থী কতটুকু অর্জন করল এবং কীভাবে তা আরও বেশি করে অর্জন করতে পারবে, সে বিষয়ে মন্তব্য লিখবেন।

তবে খাতা-কলমের চিরাচরিত পরীক্ষা যেহেতু পুরোপুরি তুলে দেওয়া সম্ভব নয়; দানবীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারলেও সামান্য কিছু ক্ষেত্রে কোচিংয়ের নাক গলানোর সুযোগ রয়ে যাবে। অর্থাৎ কোচিং হয়তো থাকবে, কিন্তু তাকে বশে রাখা আর কঠিন হবে না।

আইন করে এখনই সব ধরনের কোচিং বন্ধ করা যাবে না। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই তা যায়নি। কিন্তু এখন যেভাবে চলছে, সেভাবেও চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। কোচিং দৈত্যকে বশে আনার সবচেয়ে কার্যকর যে উপায় সেই নতুন শিক্ষাক্রমকে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সেটা খুব সহজ নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা কর্মকর্তা, অভিভাবকসহ সব অংশীজন একসঙ্গে কোমর বেঁধে না নামলে এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা যাবে না।

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক: মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক