আমরা যেভাবে ছুটির দিনের রাতে নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করলাম, তা কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি অবিশ্বাস্য, অযৌক্তিক। এই মূল্যবৃদ্ধি বেআইনি। বাংলাদেশের আইনে এটা এক ধরনের 'ফৌজদারি' অপরাধ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) যে আইন রয়েছে, তাতে এভাবে জ্বালানির দাম নির্ধারণের কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত যে নিয়ম রয়েছে; মূল্যবৃদ্ধি করতে হলে একটি গণশুনানির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে তা স্পষ্টতই লঙ্ঘিত হয়েছে। এখতিয়ার-বহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটা হয়েছে- এই অভিযোগ যদি কেউ করেন; অত্যুক্তি হবে না।

এখন হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর নেপথ্যে সরকারের দর্শনটা কী? সোজা কথায়, জনগণের ওপর চাপ বাড়াল সরকার। কিন্তু আমরা জানি, সরকার তৈরি হয় জনগণ দ্বারা। জনগণের স্বার্থ সরকার দেখে। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করেনি। জনগণের স্বার্থ বরং এখানে উপেক্ষিত হয়েছে।

আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের কথা এখানে বলা যেতে পারে। সেদিকে তাকালে দেখতে পারব, দাম কমে গেছে। এখন যদি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতেই হয়, তাহলে এ জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া রয়েছে। আগেই বলেছি, তার জন্য গণশুনানি করতে হবে। কিন্তু এখানে যেটা হলো, কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে একটা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির বিষয় একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়ার কথা ছিল। একটি নিয়ম বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোলে কিছু বিষয় থাকে, যা নজরে আনা যায়। এর মধ্যে যেসব বিষয় উঠে আসে, তা মানুষের কাছে তুলে ধরার একটা সুযোগ থাকে। এসবের একটি দালিলিক গুরুত্ব আছে। সেখানে এভাবে সরাসরি একটা জনস্বার্থবিরোধী অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়। বিইআরসিকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। কিন্তু তা না করে বিইআরসির সক্ষমতা বরং আরও কমিয়ে আনা হয়েছে এসবের মধ্য দিয়ে।

এমন তড়িঘড়ি করে মূল্যবৃদ্ধি না করে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন পর্যায়ে অদক্ষতা, সিস্টেম লস, দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে বরং কিছু সুবিধা পাওয়া যেত। অব্যবস্থাপনার কারণে মোট ব্যয়ের কত শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, তা সরকার চাইলে দেখতে পারত। বছরের পর বছর এসব চলে আসছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করা গেলে জ্বালানি অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যে দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, সেটাও ভেঙে দেওয়া যেত। যদি আমরা এসব করতে পারতাম তবে হয়তো খুব সামান্য অর্থ ঘাটতি থাকত।

আমরা দেখেছি, সরকার বছরের পর বছর এর চেয়ে বেশি দামে তেল কিনে বর্তমান দামের চার ভাগের এক ভাগে তা বিক্রি করেছে। এখন যেই আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দেখানো হচ্ছে, তখন তা কোথায় ছিল! ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১০০ থেকে ১৮৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল জ্বালানি তেলের দাম। তখন কিন্তু বর্তমানের কয়েক ভাগ কম দামে বাজারে ডিজেল বিক্রি করেছে সরকার। অর্থাৎ অতীতে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল না, বরং বেশিই ছিল। কিন্তু ডিজেল তো তখন আজকের মতো ১১৪ টাকায় বিক্রি হতো না।

বর্তমান সরকার টানা প্রায় ১৩ বছর ক্ষমতায়। ২০১১ সালে জ্বালানি তেলের দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। তখন কিন্তু আজকের দামে ডিজেল বিক্রি হয়নি। কেন তখন হয়নি? তখন সরকার কত ভর্তুকি দিত? এখন তাহলে কেন ভর্তুকি তুলে নিল- এসব প্রশ্নের কোনো পরিস্কার জবাব নেই আমাদের সামনে।


একই সময়ে সব জ্বালানির মূল্য কেন বৃদ্ধি করতে হলো? এটারও কোনো স্পষ্ট জবাব আমাদের সামনে নেই। আমরা জানি, বাংলাদেশ পেট্রোল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পেট্রোলের চাহিদার ১০০ ভাগ বাংলাদেশেই উৎপাদন হয়। বরং চাহিদার থেকে বেশি পেট্রোল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এখন পেট্রোলের দাম তাহলে কেন বাড়ানো হলো? এখন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকেরা বলতে চাইছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের জন্য এমন হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এর সঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। আমি বলতে চাই, এর সঙ্গে আমাদের রিজার্ভেরও কোনো সম্পর্ক নেই।

এর পর অনিবার্যভাবে সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামও বাড়াবে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য একটি শুনানি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন যে কোনো সময় বিইআরসি দাম বাড়ানো কিংবা না বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারে। তবে সেই গণশুনানিতে আমরা উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম। সেখানে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম- বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার নেই। তবে এ জন্য কিছু কাজ করতে হবে- যৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় করা। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, অপচয় কমানো। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সমস্যা হলো বিইআরসি আমাদের দেওয়া যুক্তি ও তথ্য আমলে নেয় না।

আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য এখন আর গণশুনানি করার দরকার নেই। একটা কমিটি করেছে বিইআরসি। ওই কমিটি ছয় মাস পরপর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলে গ্যাসের নতুন মূল্য ঘোষণা করে। এর একটি স্বাভাবিক অর্থ হলো, ছয় মাস পরপর গ্যাসের দাম বাড়বে। শেষ বিচারে গোটা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মূল্যবৃদ্ধির চাপটি গিয়ে পড়ে ভোক্তা অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ওপর।

এভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তথা আইএমএফ। আলোচনা শুনলে মনে হবে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য আইএমএফ দায়ী; কিন্তু বিষয়টি এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার যদি ঋণ চাইতে না যেত, তবে তো আর শর্তের বিষয়টি সামনে আসত না। আবার এই শর্তে আসলে কী বিষয় রয়েছে, তা এখনও পরিস্কার নয়। সংবাদমাধ্যমে কিছু বিষয় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরিস্কার করে এখনও কিছু বলা হয়নি। আমি যতখানি জানি, আইএমএফ ঘাটতি কমাতে বলেছে। এখন ঘাটতি কমাতে গিয়ে দাম বাড়ালে তো ঘাটতি কমবে না। উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে নানা ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।

ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ