খেলাপি ঋণ আদায়ে নীতি শিথিল করার প্রভাব পড়েছে আদায়ের ওপর। চলতি বছরের প্রথম তিন মাস খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে মাত্র ২ হাজার ১১ কোটি টাকা আদায় করেছে ব্যাংকগুলো। করোনার প্রভাব শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে যেখানে আদায় ছিল ২ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। আদায় কমেছে ৯৬০ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৩১ শতাংশ।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করতে এমনিতেই নানা ফন্দি আঁটেন। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কম দেখানোর নানা নীতির কারণে ঋণ পরিশোধে তাদের অনাগ্রহ আরও বেড়েছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর কেউ ঋণ পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি না করার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সালে একজন ঋণগ্রহীতার যে পরিমাণ ঋণ শোধের কথা, ১৫ শতাংশ পরিশোধ করলে তা নিয়মিত রাখা হয়। সম্প্রতি এক নির্দেশনার মাধ্যমে একটি খেলাপি ঋণ চার দফায় ২৯ বছর পর্যন্ত পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব পর্যায়ে ডাউনপেমেন্টের হার কয়েকগুণ কমানো হয়েছে। আবার পুনঃতপশিলের পর নতুন ঋণ নিতে আগে যেখানে ১৫ শতাংশ কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট দেওয়া লাগত এখন তা ৩ শতাংশে নামানো হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান সমকালকে বলেন, কয়েকটি কারণে খেলাপিদের ঋণ পরিশোধ কমতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সার্কুলারের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে শিথিলতা দেওয়া হয়েছে। এতে করে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও হয়তো তারা পরিশোধ করছেন না। নিজেদের কাছে টাকা রেখে দিচ্ছেন। আরেকটি কারণ হতে পারে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ যাচ্ছে। এখন শিথিলতা কমিয়ে ব্যাংকের উচিত হবে কঠোর হওয়া। বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি বা অন্য উপায়ে আদায়ের ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে খেলাপিদের থেকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। গত বছরের প্রথম তিন মাসে তা আরও কমে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকায় নামে। খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ, অবলোপন করা খেলাপি ও অন্যান্য আদায়ের হিসাব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবলোপন করা খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে হিসাব করা হলেও তা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত। গত মার্চ পর্যন্ত অবলোপনসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন করা খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। আর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে খেলাপি ঋণের বিপরীতে নগদ আদায় হয়েছে মাত্র এক হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের একই সময়ে যা ২ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা ছিল। একই প্রান্তিকে ২০২০ সালে ছিল এক হাজার ৭১০ কোটি এবং ২০২১ সালে ছিল এক হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে অবলোপন থেকে আদায় হয়েছে ২০৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালে যা ছিল ২২৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ছিল ১৪২ কোটি টাকা। তার আগের বছর ছিল ১৯৯ কোটি টাকা। নগদ বাদে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্যান্য আদায় হয়েছে ১৮১ কোটি টাকা। গত বছরের প্রথম তিন মাসে যা ছিল ৩১৮ কোটি টাকা। ২০২০ সালে একই সময়ে ছিল ৩০২ কোটি এবং তার আগের বছর ছিল ৩২৩ কোটি টাকা।