ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর. এফ. হোসেন ২০২২-২৩ মেয়াদে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স ইন বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ এসএমই ফাউন্ডেশন এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন, বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ২০১০ সাল থেকে আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এর আগে ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি এএনজেড গ্রিন্ডলেস ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিভিন্ন পদে দেশে-বিদেশে কাজ করেছেন। সেলিম আর. এফ. হোসেন ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সমকাল: ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠন বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালাকে কীভাবে দেখেন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: এত দিন ঋণ পুনঃতপশিলের সিদ্ধান্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হতো। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে দায়িত্বটা ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক গ্রাহককে চেনে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু চেনে না। শুধু কাগজ-কলম দেখে ভালো মূল্যায়ন করা যায় না। বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিলের জন্য অনেক ব্যাংক দিনে ৫ থেকে ৬টি আবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাচ্ছিল। ফলে এমনও দিন গেছে যে, একশ পুনঃতপশিলের আবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। এত কেস তো এক দিনে যাচাই করা সম্ভব নয়। দেখা গেছে, ব্যাংক হয়তো চেয়েছে ৫ বছরের জন্য দিতে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেটে ৩ বছর করে দিল। এর চেয়ে বেশি কিছু করারও ছিল না। যে কারণে নতুন গভর্নর বলেছেন, ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। ব্যাংক গ্রাহককে চেনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন তার ঋণ পুনঃতপশিলের দায়িত্ব নেবে?
সমকাল: এতে সুশাসন নিশ্চিত হবে?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: এত দিন অনেক ব্যাংকারের ধারণা ছিল, দায়িত্ব তো বাংলাদেশ ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংক অনাপত্তি দেওয়ার পর ব্যাংক থেকে আর কোনো পরিদর্শন হতো না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বার্ষিক পরিদর্শনে এসে যখন জানত, তারাই অনুমোদন দিয়েছে; এ নিয়ে হয়তো আর কথা বলত না। এভাবে অনেক ক্ষেত্রে 'ডিউ ডিলিজেন্স' পরিপালন হতো না।
সমকাল: তার মানে, ব্যাংকের জন্য এ নীতিমালা ভালো হয়েছে?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: এটা ব্যাংকিং খাতে অনেক বড় সংস্কার। ব্যাংকই গ্রাহককে চিনে ঋণ দিয়েছে। ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু প্যারামিটার দিয়েছে; সে আলোকে ব্যাংককে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ঋণ পুনঃতপশিলের কোনো ফাইল আর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে না। নিয়মের মধ্যে ব্যাংক ঋণ পুনঃতপশিল করবে। কোনো ঋণ আদায় না হলে তারাই আইনি ব্যবস্থা নেবে। এতে যেসব ব্যাংকের সুশাসন আছে; ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব আছে; তাদের জন্য এটা ভালো। আগে হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর পর অনেক দিন ফাইল পড়ে থাকত। এখন ব্যাংক চাইলে তিন দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে; যা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে হবে বড় সহায়ক।
সমকাল: যেসব ব্যাংকের সুশাসনের অভাব আছে, তাদের জন্য এই নীতিমালাকে কীভাবে দেখেন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: দায়িত্ব এখন ব্যাংকেরই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামীতে পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করার বার্তা দিয়েছে। এ নীতিমালার ফলে যেসব ব্যাংকে সুশাসন নেই; তাদের বাধ্য হয়ে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের কথা বলে পার পাবে না। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকিং খাতের জন্য অনেক ভালো হবে। ব্যাংকারদের ওপর দায়িত্ব আসায় অনেকে ভয় পেয়ে গেছে। গভর্নর জানিয়ে দিয়েছেন, যে কোনো দিক থেকে অনৈতিক চাপ দেওয়া হলে তিনি পাশে দাঁড়াবেন। অনৈতিক চাপে কেউ খারাপ মূল্যায়ন করে সুবিধা দিলে সে দায় তাদেরই নিতে হবে। এখন ব্যক্তি পর্যায়ে দায়বদ্ধ করা হবে।
সমকাল: আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে ২০১২ সালে ঋণ পুনঃতপশিল নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোই তো খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল করতে পারত।
সেলিম আর. এফ. হোসেন: ওই নীতিমালা থেকে ২০১৯ সালে সরে আসা হয়। কার্যত সব আবেদনই বিশেষ বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো শুরু হয়। সে বিবেচনায় পুনঃতপশিলের নতুন এ সার্কুলার বিজ্ঞ, বিস্তারিত, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত। বাস্তবসম্মত এ জন্য যে, এখন তো একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখান থেকে বের হতে হবে। প্রথমে ব্যাংককেই চেষ্টা করতে হবে, কীভাবে গ্রাহককে খেলাপি থেকে বের করে ব্যবসায়িক দিকে নেওয়া যায়। তা না করে একবারে আইনি ব্যবস্থা নিলে তাতে কিন্তু কারও লাভ নেই। তার চেয়ে কিছু সুবিধা দিয়ে ব্যবসায় ফেরানো গেলে ভালো। তবে কোনো গ্রাহক যদি অনৈতিক কিছু করে; এক খাতের নামে টাকা নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করে; ইচ্ছাকৃত খেলাপি হন, তাঁকে তো এই সার্কুলারে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়নি। নীতিমালা ভেঙে কেউ যদি সুবিধা দেয়, সে দায়িত্ব ব্যাংকারকে নিতে হবে। তবে হ্যাঁ, ২০১২ সালের ওই সার্কুলারে আবার আমাদের ফেরত যেতে হবে। রাতারাতি এটা হবে না। ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণ ও মূলধন পর্যাপ্ততায় আন্তর্জাতিক মানের দিকে যেতে হবে।
সমকাল: সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ। এই নীতিমালায় চার দফায় ২৯ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিথিল নীতিমালার অপব্যবহার করে ব্যাংক খাতের অবস্থা আরও খারাপ হলে তার দায় কে নেবে?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: গাণিতিক হিসাব করে এটা ২৯ বছর বলা যাবে না। বিষয়টি এমন- পাঁচ বছর মেয়াদি ১০০ টাকার একটা ঋণ। হয়তো চার বছর পর খারাপ হলো। এর মধ্যে তো সে ৮০ টাকা পরিশোধ করবে। নূ্যনতম সুশাসন না থাকলে ব্যাংক নতুন ঋণ দেবে না। আবার কীসের ভিত্তিতে ঋণটি পুনঃতপশিল করা হলো এবং নতুন ঋণ দেওয়া হলো- এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। আবার পুনঃতপশিল করা ঋণে একবার নতুন ঋণ দেওয়ার পর তা খারাপ হলে তৃতীয় দফায় অনেক ব্যাংক আবার নতুন করে ঋণ দিতে চাইবে বলে মনে হয় না।
সমকাল: এ ধরনের নীতিমালায় সাফল্যের উদাহরণ আছে?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: যেমন ভারতে মনমোহন সিংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে অর্থমন্ত্রী বানানো হয়। তিনি অর্থমন্ত্রী হয়ে ডি-রেগুলেশন, গ্লোবালাইজেশন ও লিবারালাইজেশনের ওপর জোর দেন। এই তিন সম্বলের ভিত্তিতে ভারতের অর্থনীতি বদলে গেছে। এখন তাদের দেশি ব্যাংকগুলো বড়; বিদেশি ব্যাংকের আকার ছোট হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬০০ বিলিয়নের কাছাকাছি। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ না করে বেসরকারি খাতের ওপর কিছু বিষয় ছেড়ে দিলে সবার জন্য ভালো হয়। অবশ্য দু'চারটা দুষ্ট লোক থাকবে। তাদের ঠেকাতে বিভিন্ন উদ্যোগ থাকতে হবে। তবে শুধু সার্কুলার দিয়ে সব অনিয়ম বন্ধ করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি বহিঃনিরীক্ষক দিয়ে যাচাই করা হবে। ফলে কেউ আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাবে না।
সমকাল: মেয়াদি আমানতে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। আবার ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যস্ম্ফীতি যখন বাড়ছে, তখন সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া উচিত?
সেলিম আর. এফ. হোসেন: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) থেকে ঋণের সুদহার বিষয়ে কিছু সুপারিশ বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সিএমএসএমই খাত ও রিটেইল ঋণে কিছু শিথিলতা চাওয়া হয়েছে। কেননা, এ ধরনের ঋণের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। মূল্যস্ম্ফীতি ব্যবস্থাপনা করতে গেলে সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা কমাতে হবে। আরেকটি উপায় হলো, কর বাড়িয়ে ব্যবহারযোগ্য আয় কমানো। তবে উভয় ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। এখন বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে। এ সময়ে সুদহার বাড়ালে বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যেতে পারে। এর পরও আমি মনে করি, সব ধরনের সুদহার নির্ধারণ বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।