ড. আহসান এইচ মনসুর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ থেকে অবসর গ্রহণের আগে তিনি সংস্থাটিতে আড়াই দশকের অধিক সময় কর্মরত ছিলেন। আইএমএফে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮২ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৭৬ সালে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
সমকাল: আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি-ব্যবস্থাপনা একটু এলোমেলো দেখা যাচ্ছে। এর কারণ কী?
আহসান এইচ মনসুর: সামগ্রিক অর্থনীতির যে ধারাবাহিকতা ছিল; যেটা এখনও আছে বলে মনে করি, তার মূলে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় কমবেশি রক্ষণশীল। সামগ্রিক ফিসক্যাল ম্যানেজমেন্ট তারা করে এবং যেভাবেই হোক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা মোটামুটি ভালোভাবে করে আসছে গত ২০-২৫ বছর ধরে। এর কারণটা হলো, তারা বিভিন্ন সময়ে আইএমএফের পরামর্শ গ্রহণ করছিল; বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও ছিল। এসব কারণে একটা রক্ষণশীল সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলতে পেরেছে, যেটা এখনও চলমান। তবে এ সংস্কৃৃতি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আছে, রাজনৈতিক পর্যায়ে নেই। আর ইদানীং এর কিছুটা ক্ষয় হয়েছে বলে মনে হয়। ওই সংস্কৃতির কারণেই সরকার ব্যাপকভাবে ঋণ নেয়নি; ব্যাপকভাবে টাকা ছাপানো হয়নি; ব্যাপকভাবে খোলাবাজার থেকে বিদেশি ঋণও নেয়নি। যখনই রাজস্বে ঘাটতি হয়েছে, তখনই ব্যয় কমানো হয়েছে।
সমকাল: বাজেট ঘাটতি তো প্রতিবছরই দেখা যায়।
আহসান মনসুর: প্রতিবছরই রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু বাজেট ঘাটতি জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশের আশপাশে রেখেছে। খেয়াল করবেন, ভালো বছরগুলোতে বাজেট ঘাটতি ৩, সাড়ে ৩, ৪ শতাংশ- এ রকম ছিল; ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে দেয়নি। যখন থেকে তা ৫ শতাংশ অতিক্রম করতে শুরু করেছে, তখনই সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা একটু নড়বড়ে হতে শুরু করেছে। ফিসক্যাল ব্যবস্থাপনাকে আমি বলি সামগ্রিক অর্থনীতির নোঙর। ম্যাক্রো স্ট্যাবিলিটি শুরু হয় প্রধানত ফিসক্যাল স্ট্যাবিলিটি থেকে। এখানে আরেকটা বিষয় কাজ করে, তাহলো বিদেশি ঋণ; সেটা পাবলিক হতে পারে, প্রাইভেটও হতে পারে। আর ফিসক্যাল পলিসি যখন ঢিলে হয়ে যায়, তখন মনিটারি পলিসিও ঢিলে হয়ে যায়। কারণ সরকারের যখন টাকা দরকার হয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর তারা চাপ দেয় এবং টাকা ছাপানোর পরিমাণ বেড়ে যায়। যতই বলা হোক কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন- তা খুব কম দেশেই কাজ করে।
সমকাল: ফিসক্যাল ব্যবস্থাপনা এখনও মোটামুটি ভালো থাকলে এখনকার অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী?
আহসান মনসুর: সমস্যটা মূলত রাজস্ব আহরণে। সেখানে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ সবসময়ই কম রাজস্ব আদায় করে। যখন প্রথম ভ্যাট চালু হলো ১৯৯১ সালে; আমাদের রাজস্ব আহরণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এটা ৭-৮ বছর ভালো ছিল। কিন্তু যে কোনো সংস্কারকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হয়; না করলে এটা আস্তে আস্তে কম কার্যকর হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের পর আমাদের কর নীতি ও প্রশাসনে কোনো বড় সংস্কার হয়নি। এটা ভ্যাটের ক্ষেত্রে হয়নি, আয়করে হয়নি; কাস্টমসেও হয়নি। ভ্যাটের ক্ষেত্রে একটা আইন হয়েছিল ২০১২ সালে; এর সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালের দিকে যখন ওই আইন বাস্তবায়নে যায়, তখন এটাকে অনেক পরিবর্তন করে পুরোপুরি নষ্ট করে দেওয়া হয়। যে কারণে এ থেকে কোনো সুফল বাংলাদেশ পায়নি।
সমকাল: আইনটা পরিবর্তন করতে হলো কেন?
আহসান মনসুর: ২০১২ সালে যেভাবে আইনটা করা হয়েছিল, সেটা কর প্রশাসনের বর্তমানের জিওগ্রাফিক্যাল ভিত্তির পরিবর্তে ফাংশনাল ভিত্তিতে করার কথা ছিল। অর্থাৎ একটা ডিপার্টমেন্ট শুধু নিবন্ধন দেখবে; কর্মকর্তারা শুধু নিবন্ধনই দেখবেন; যিনি অডিট ও ইন্সপেকশন দেখবেন তিনি অন্য কিছুতে নাক গলাবেন না; আরেকজন দেখবেন রিটার্ন প্রোসেসিং ঠিক আছে কিনা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কর কর্মকর্তারা এ পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন; কেন করেছেন তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। এখন মাঠ পর্যায়ের কর কর্মকর্তারা অনেকটা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। করদাতার প্রতিটা কার্যক্রম একজনই তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করেন। এত ক্ষমতা মাঠ পর্যায়ের কর কর্মকর্তা ছাড়তে চান না। বিশ্বের বহু দেশের কর প্রশাসন ফাংশনাল লাইনে চলে গেছে; আমরা পড়ে আছি প্রাচীন ধারায়, যা প্রবর্তন করা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। আমরা বলেছিলাম, ট্যাক্স পলিসির জন্য একটা আলাদা বিভাগ করা হোক, এনবিআরের সঙ্গে যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক থাকবে না। এনবিআর শুধু কর প্রশাসন দেখবে। কর নীতি দেখবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন কর বিভাগ। এই পৃথককরণের সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে জনগণের সঙ্গে করদাতাদের প্রত্যক্ষ দেখা-সাক্ষাতের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। সব যোগাযোগ হবে চিঠিপত্র বা ই-মেইলের মাধ্যমে; করদাতাকে কর প্রশাসন চিনবেই না। এগুলো হচ্ছে সাধারণ মৌলিক সংস্কার। এখন কর কর্মকর্তাদের একমাত্র কাজ হলো, লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে কর আদায় এবং তার মাধ্যমে করদাতার ওপর অযাচিত চাপ প্রয়োগ করা। অর্থাৎ কর সেবার মৌলিক দায়িত্বটা থেকে তারা সরে এসেছিল।
সমকাল: আপনি বলছেন, বর্তমান সংকটের জমিনটা আগেই তৈরি হয়ে ছিল?
আহসান মনসুর: এতক্ষণ যা বলা হলো তাতে দেখা যাচ্ছে, একদিকে কঠোর ফিসক্যাল ব্যয় ব্যবস্থাপনা, আরেকদিকে রাজস্বের ব্যাপক ঘাটতি। ফলে বাজেটের আকার ছোট হচ্ছে। যেখানে আমার শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ শতাংশ ব্যয় করা উচিত, সেখানে দিতে পারছি মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ দরকার, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। সামাজিক বেষ্টনীতে দরকারমতো দিতে পারছি না; এগুলোতে কাটছাঁট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মান যতটা ভালো হওয়া উচিত ছিল ততটা ভালো হচ্ছে না। মূল কারণটা হচ্ছে রাজস্ব ঘাটতি। এটা সরকারকে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নিয়ে যাচ্ছে এবং গেছে। যে কারণে একটু ব্যয় করতে গেলেই সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। এগুলো হলো কাঠামোগত সমস্যা। এগুলোর কারণেই যে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে, তা বলছি না। যা বলতে চাইছি তা হলো, এগুলোর কারণে সংকটটা ঠিকমতো মোকাবিলা করা যাচ্ছে না।
সমকাল: তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সম্ভবত আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা...।
আহসান মনসুর: দেশের আর্থিক খাত কিন্তু শক্তিশালী হচ্ছিল। ২০১০ সালের আর্থিক খাতের রিপোর্ট যদি ২০০১ সাল বা তারও আগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি; বিশাল পরিবর্তন- ইতিবাচক পরিবর্তন। বিএনপির দ্বিতীয় সরকারের সময় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের হাতে আর্থিক খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন অনেক হয়েছিল। অনেক আবেদন সত্ত্বেও তখন কোনো নতুন ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। কিন্তু ২০১০-এর পর ঢাকনাটা উঠে যায়। ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো ছিল যখন সরকারের সদিচ্ছা ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে চাপের মধ্যে রেখে খারাপ ঋণ কমিয়ে ১৩-১৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে আবার বেড়ে ৩৫-৩৬ শতাংশে উঠে গেছে। ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য আমরা মাপি রিটার্ন অন ইকুইটি দিয়ে। ওই সময় তা ছিল ২৪-২৬ শতাংশ, এখন কমে মাত্র সাড়ে ৪-৫ শতাংশ; রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, এখন কমে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এগুলো এক দিনে হয়নি; ক্রমান্বয়ে হয়েছে। সরকার এখন সুদের হার বেঁধে রেখেছে। এভাবে মূল্যস্ম্ফীতি কমবে না।
সমকাল: কীভাবে কমতে পারত?
আহসান মনসুর: আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ২০১২ সালে সুদের হার ১৩ শতাংশে বেঁধে দেওয়া ছিল। মুদ্রার বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে বেঁধে দেওয়া ছিল ৬৯ টাকায়। তখন বেসরকারি ঋণের প্রবাহ ২৫ শতাংশে পৌঁছে গেল এবং আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল; যদিও সংকট পর্যায়ে যায়নি। তার আগেই এ সমস্যার সমাধান করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত ও গভর্নর ড. আতিউর রহমান সুদের হারের নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে এবং একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করে। এই কার্যকর ব্যবস্থার কারণে বাজারে দ্রুত স্থিরতা এসেছিল। এই পরিবর্তন থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারতাম; কিন্তু শিক্ষা নিই নাই।
সমকাল: শিক্ষা নিলে কী করা যেত?
আহসান মনসুর: যদি সুদের হারে দেওয়া সীমা না থাকত; বিনিময় হার বাজারনির্ভর থাকত তাহলে এই চলমান সমস্যা এত বড় ও দীর্ঘস্থায়ী হতো না। প্রতিবছর ডলারে ২-৩ টাকা করে ছাড় দিলে তা বেড়ে বেড়ে হয়তো আজকের পর্যায়ে আসত। কিন্তু অর্থনীতি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তা সয়ে নিতে পারত। এখনকার মতো প্রচণ্ড প্রতিঘাত সহ্য করতে হতো না। যেমন আমাদের সরকারি বৈদেশিক ঋণ শুধু বিনিময় হারের কারণে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। বেসরকারি ঋণ ২৫ বিলিয়ন ডলার; টাকার পরিমাণে তা বেড়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যক্তি খাতের পক্ষে এ ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত শোধ করা কি সহজে সম্ভব? কিন্তু ডলার যদি ২ টাকা করে বাড়ত প্রতিবছর তাহলে ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন- তাঁরা কি বিদেশি ঋণ নেবেন, না দেশি উৎস থেকে। সরকার কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম কমিয়ে রাখার কারণে অনেক ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ঋণের ফাঁদে পড়ে গেল। উপরন্তু এই ২৫ বিলিয়নের ১৫ বিলিয়ন ডলার এ বছরই শোধ করতে হবে। আমাদের অনেক করপোরেট হাউসেরই এ ধরনের বিদেশি ঋণ আছে। কোত্থেকে দেবে তারা এত টাকা, যদি রোল ওভার করতে না পারে? আবার টাকা নিয়ে এসে যদি করপোরেট হাউসগুলো বলে, ডলার দেন; সেন্ট্রাল ব্যাংক না দিতে পারলে বদনামটা কার হবে? আরেকটা বিষয়, ১৫ বিলিয়ন হয়তো রোল ওভার করার চেষ্টা হবে, কিন্তু এ বছর তা কঠিন হবে। কারণ ডলার সব আমেরিকার দিকে চলে যাচ্ছে সুদের হার সেখানে বেশি বলে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করেছিল যখন তাদের দেশে সুদের হার ছিল শূন্যের কোঠায়। আর এখন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ায় ঋণ পরিশোধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ডলার ফেরত নিয়ে আমেরিকায় খাটাবে। ফলে রোল ওভার করাও কঠিন হবে বা উচ্চ মূল্য দিতে হবে।
সমকাল: ডলারের সংকট তো হয়েছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়ায়।
আহসান মনসুর: আমেরিকা সুদের হার বাড়িয়েছে তাদের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ম্ফীতি কমানোর জন্য। তার ফলে ডলার এখন আগের চেয়ে দামি হয়ে গেছে। আমেরিকা সুদের হার বাড়ানোয় বাংলাদেশ ছাড়া অন্য প্রায় সব দেশেই সুদের হার বেড়ে গেছে। কিন্তু আমরা একই জায়গায় রয়ে গেছি। এখানে সুদের হার সেই ৬ ও ৯ শতাংশেই রয়ে গেছে। এর মূল্য কি দিতে হবে না? এখন মুদ্রানীতি ও বিনিময় হারের সমস্যা একসঙ্গে হয়েছে; একটা থেকে আরেকটা আলাদা করা যাবে না। একটা হলো, আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। সেটা না কমালে রিজাভের্র আরও পতন হবে। তাই আমদানি কমিয়ে লেনদেনের ভারসাম্য কমিয়ে আনা হচ্ছে। সরকার মনে করে, ৯ শতাংশ সুদের কারণে ব্যক্তি খাতে সুদের হার কমেছে এবং বিনিয়োগ বেড়েছে। আসলে সুদের হার কম ছিল বিশ্বপরিস্থিতির কারণে। দুনিয়াব্যাপী সুদের হার তখন কম থাকার কারণে উদীয়মান বাজারগুলোতে সবাই টাকা ঢালতে চেয়েছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদের আশায়। এখন পরিস্থিতি উল্টো হয়ে গেছে। অতএব ওই ডলার স্রোত কমে গেছে বা উল্টোমুখী হয়েছে।
সমকাল: অনেকে বলছেন, সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ কমে যাবে।
আহসান মনসুর: আমি মনে করি, সরকার এ মুহূর্তে ডলার সংকট কাটাতে সুদের হার বাড়াতে পারে। ডলার রেট স্থির হলে সুদের হার আবার কমাতে পারবে। এ মুহূর্তে টাকাকে সাপোর্ট দেওয়া দরকার, কিন্তু সেটা সরকার দিতে পারছে না। পৃথিবীর সব উন্নয়নশীল দেশই তাদের মুদ্রাকে সুদের হার বাড়িয়ে সাপোর্ট দিচ্ছে। তবে আমরা কেন বসে আছি?
সমকাল: সরকার তো বলছে, ডলারের এ সংকট থেকে আমরা অচিরেই বেরিয়ে আসব।
আহসান এইচ মনসুর: হ্যাঁ, বেরিয়ে আসবে এক সময়, কিন্তু কখন- তা এখনও পরিস্কার নয় এবং এর ক্ষত কি মুছে যাবে? যুদ্ধবিরতি হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করব না? ধরুন ১০৮ বা ১১০ টাকায় ডলার স্থির হলো। কিন্তু এর প্রভাবে ঋণের বৃদ্ধি কতটুকু হবে, তা আমি আগে বলেছি। সেটা সামাল দেব কীভাবে? সরকার বাড়তি এক লাখ ৮০ হাজার কোটি রাজস্ব থেকে কীভাবে দেবে? বেসরকারি খাত ওই ঋণের বাড়তি টাকাটা কোথা থেকে আনবে? এর দায় কে নেবে? ভারত ও আমরা কিন্তু একই পথে ছিলাম। ওরা ঠিকই অল্প অল্প করে ডলারের দাম ও সুদের হার বাড়িয়েছে। ফলে আজকে বিশ্ববাজারের ধাক্কা ওরা সামাল দিতে পারছে ভালোভাবে। ওদের মতো করলে আমরা হয়তো ৯৫ টাকায় ডলারের মূল্য স্থিতি করতে পারতাম।
সমকাল: সরকার আইএমএফের ঋণের ব্যাপারে ঢাকঢাক গুড়গুড় করছে কেন?
আহসান মনসুর: সরকারের ইচ্ছা হয়তো সবকিছু যেমন আছে তেমন রেখে দেওয়া- সুদের হারের সীমা তুলব না; বিনিময় হার বেঁধে রাখব; বাজেট ছোট হলেও রাজস্ব যা আসছে আসুক। সে কারণে সরকার দেখার চেষ্টা করছে আইএমএফের ঋণের সঙ্গে শর্ত কী দেয়; যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে নেবে, না হলে নেবে না। তবে এ কথা স্বীকার করব, অতি সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার একটি বড় ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বকে। সরকার আইএমএফের সঙ্গে ভবিষ্যতের দর কষাকষির ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক শর্তকে মেনে তার ইচ্ছার গুরুত্বের প্রমাণ দিয়েছে।
সমকাল: কিন্তু সরকারকে তো ফরেন কারেন্সি নিতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর: না, একেবারে যে নিতে হবে, তেমন বলা যায় না। বাজেট ব্যবস্থাপনায় একটু অসুবিধা হবে। এ বছর ১১ বিলিয়ন ডলার লাগবে নিট বিদেশি ঋণ খাতে; বিদেশি ঋণ পরিশোধের বিষয় ধরলে আরও আড়াই বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত লাগবে। বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রাক্কলিত করা হয়েছে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। এগুলোর জন্য অবশ্যই সরকারকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হবে। তবে সরকার চাচ্ছে যতটা সম্ভব শর্ত এড়িয়ে তা পেতে। গত বছর বাংলাদেশ কয়েক বিলিয়ন ডলার পেয়েছে কভিড-১৯-এর কারণে কোনো শর্ত ছাড়া। এ বছর তেমনটা হবে বলে মনে হয় না। সরকার কিছুদিন আগ পর্যন্ত মনে করেছে, সবকিছু যেভাবে চলছিল সেভাবেই আমরা বিকশিত হতে থাকব; কোনো সংস্কার লাগবে না। এক ধরনের আত্মতুষ্টিতে ছিল। আমরা আশা করি, সরকার এই আত্মতুষ্টির অবস্থা থেকে বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচিতে হাত দিক, যা বহুদিন ধরে থমকে আছে। স্থায়ী সংস্কারের মাধ্যমেই বর্তমান অবস্থা থেকে টেকসইভাবে আমরা বের হয়ে আসব এবং আবার
দৃঢ় পায়ে উন্নয়নের সোপানে এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ।