দেশের চালের বাজারে কয়েক বছর ধরে যে অস্থিরতা চলছে; এটা হতাশাজনক যে, তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের মনে আছে, ২০১৬ সালেও খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি ছিল গড়ে ৩৫ টাকা; সরু চাল ৪০-৪২ টাকা। ২০১৭ সালে হাওরে আকস্মিক বন্যায় সেখানকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান নষ্ট হলো; সেই সঙ্গে মোটা চালের দাম হয়ে গেল কেজি ৪২-৪৬ টাকা, সরু চাল ৫৪-৫৬ টাকা। সব ধরনের চালের দাম সেই যে বেড়ে গেল, আর কমলো না। বাড়তে বাড়তে মোটা চালের কেজি হয়ে গেল ৫০-৫২ টাকা, সরু চাল ৭০-৭৫ টাকা। সর্বশেষ খবর হলো, মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫-৫৬ টাকা কেজি দরে, সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৭৫-৯০ টাকায়। এর মধ্যেই আবার জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। তার অবধারিত প্রভাবে, যেমনটা চালের পাইকারি কারবারিরা দাবি করছেন, বিশেষ করে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের চালের দামে আরেক দফা উল্লম্ম্ফন ঘটবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য, বিশেষ করে যাঁরা সীমিত আয়ের মানুষ, তাঁদের জন্য কোনো দিক থেকেই ভালো খবর নেই। দুই বছরের করোনা মহামারি এ মানুষদের কী পরিমাণ বিপর্যস্ত করেছে, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে প্রধান খাদ্য চালসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের বাজারে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহতভাবে চলছে।
এ অসহনীয় পরিস্থিতিতে মানুষ হয়তো একটু সান্ত্বনা খুঁজে পেত, যদি রাষ্ট্রের কর্ণধাররা তাঁদের এ দুর্ভোগ লাঘবে কোনো প্রয়াস চালাতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের মন্ত্রী-আমলারা তা তো করেনইনি; এমনকি পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছেন বলেও মনে হয় না। কখনও তাঁরা বলছেন, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও মানুষ 'কষ্টে নেই'; কখনও বলছেন, এ অবস্থা সাময়িক, অচিরেই তা 'স্বাভাবিক' হয়ে যাবে। আমাদের মনে আছে, সেই ২০১৭ সালের বন্যায় হাওরে ধান নষ্ট হওয়ার পর যখন তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জোর গলায় বলেছিলেন, আমাদের ১৫-২০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে; হাওরে ৬ লাখ টন নষ্ট হলেও সমস্যা হবে না- তখনই বাজারে চালের দাম একটু একটু করে বাড়ছিল। এই উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদনের কথাটা কিছুদিন আগেও, বিশেষ করে বোরো ধান কাটার সময়েও আমরা শুনেছি। বাস্তবতা হলো, এরই মধ্যে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে আমরা জেনেছি, সরকার এবার ধান ও চাল কেনার যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, তা-ই পূরণ হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, কৃষকের কথিত স্বার্থ রক্ষার কথা বলে সময়মতো চাল আমদানির সুযোগ না দেওয়ায় চালের বাজার যখন আরও গরম হয়ে গেল, তখন মজুতবিরোধী কিছু বিক্ষিপ্ত অভিযান চালানো হলো। তাতেও যখন কোনো কাজ হলো না, তখন কর-শুল্ক্ক কমিয়ে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো। ততদিনে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশেও ডলার সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। ফলে বেসরকারি আমদানিকারকরা চাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার সাহস পাচ্ছেন না। আর কোনো প্রকার লাগাম পরানোর ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে চালের বাজার যেমন আচরণ করার কথা, তেমনই করছে। আমরা দেখছি, বাজারের আগুনে পুড়ে মরছে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারও।
চালসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বর্তমান সরকার নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে- এ কথা অস্বীকার যাবে না। কিন্তু তা যে দেশের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়- এটাও মানতে হবে। আরও বড় সমস্যা হলো, দেশে বছরে শুধু চাল নয়, কোন খাদ্যপণ্য কতটুকু লাগে, তার প্রকৃত তথ্য আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে আছে বলে মনে হয় না। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনজীবনে বিরাজমান সমস্যাকে কখনও লঘু করে দেখানো; কখনও স্বীকার না করার শাসকশ্রেণির চিরাচরিত অভ্যাস। আমরা মনে করি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকারকে অবিলম্বে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিষয় : অসময়ের দশ ফোঁড় সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন