চাকচিক্যময় এই মহানগরীতে একেকজন গৃহকর্মীর বিবর্ণ প্রাণটুকুও যখন ঝরা পাতার মতো পড়ে যায়, তখন আমরা ক্ষণিকের উপলব্ধি করি আপাত আলোকোজ্জ্বল অট্টালিকাগুলোর কোণে কোণে কতটা অন্ধকার লুকিয়ে থাকে। তখন মুহূর্তের জন্য পাদপ্রদীপে আসে কীভাবে প্রত্যন্ত গ্রামের অভাবকিষ্ট পরিবারের শিশু কিংবা কিশোরীরা সামান্য ক্ষুণ্ণিবৃত্তির জন্য এই নগরীর ইট-কাঠের নিচে চাপা পড়ে থাকে। কখনও কখনও সেই শিকড়টুকু হারিয়েও তারা হয়ে ওঠে সামাজিক সংখ্যামাত্র। কিন্তু অভিজাত বনানী এলাকায় 'অস্বাভাবিক মৃত্যু' নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া রেখা বেগমের ভাগ্যে যেন তাও জুটতে দেওয়া হয়নি। মাত্র ২০ বছরের জীবনে দুই দফায় এক যুগের বেশি কাজ করেছে যে বাসায়, সেই গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে পুলিশ তার পৈতৃক পরিচয়টুকুও উদ্ধার করতে পারেনি। যেন সড়কে যেমন বেওয়ারিশ কুকুর কিংবা বিড়াল গাড়িচাপায় মরে থাকে; যাদের নিদেনপক্ষে টম কিংবা মিনি নামটুকুও থাকে না; গৃহকর্মী রেখা বেগম যেন তার চেয়েও তুচ্ছ। সাড়ে ১২ বছর তার 'সেবা' নিয়েছে; অথচ মৃত্যুর ঠিকুজি পর্যন্ত জানাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত পুলিশই তদন্ত করে হিমাগার থেকে লাশ পাঠিয়েছে বরগুনার আমতলীতে স্বজনদের কাছে। প্রশ্ন জাগে- গৃহকর্মীদের জন্য মর্যাদা ও মানবিকতা কতদূর? দীর্ঘ আইনি পথে অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিকার তো আরও পরের প্রশ্ন।
বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও মর্যাদ রক্ষার প্রশ্নে অনেকবার আমরা দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছি। আমরা জানি, নেহাত পেটের দায়ে পরের বাড়িতে কাজ করতে আসা শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীরা গৃহকর্তা বা কর্ত্রীর বিচিত্র বীভৎসতার শিকার হয়ে থাকে। উদয়াস্ত নয়; আলো ফোটার আগ থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গৃহকর্মীরা নিভৃত গৃহকোণে নীরবে কাজের বিনিময়ে উপযুক্ত মজুরি দূরে থাক; মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদাও সব সময় জোটে না। সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মীর অচিন্তনীয় নিগ্রহের চিত্র প্রায় নিয়মিত বিরতিতে দেখে থাকি আমরা। কয়েক বছর আগে দেখেছি, এমনকি আমাদের জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের ঘরেও কীভাবে গৃহকর্মী নির্যাতিত হয়েছে। নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে 'সোচ্চার' পেশাজীবীদের ঘর থেকেও গৃহকর্মী নির্যাতনের দুগন্ধ বের হতে দেখেছি আমরা। সেই বিবেচনায় আমরা বরাবরই দেখতে চেয়েছি যে, গৃহকর্মী নির্যাতন, হত্যা বা আত্মহত্যার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। এক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবার থেকে আসা গৃহকর্মীর পরিবার যেন গৃহকর্তা বা সংশ্নিষ্টদের প্রভাবের কাছে পরাজিত না হয়, সে ব্যাপারেও আমরা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছি সমাজ ও রাষ্ট্রকে।
এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা একাধিক প্রসঙ্গে বলেছি যে- কেবল নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী ও তার পরিবারের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির স্বার্থে নয়; বরং ভবিষ্যতে গৃহকর্মী নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি এড়াতেও সতর্কতা ও ন্যায়পরায়নতা জরুরি। এও মনে রাখা জরুরি- গৃহকর্মীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায় কেবল বক্তি বিশেষের সদিচ্ছায় ছেড়ে দিলে চলবে না। এজন্য যেমন সমাজ, তেমনই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতেই হবে। স্বীকার করতে হবে, বিলম্বে হলেও গৃহকর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে। গৃহীত হয়েছে 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি'। এই নীতিমালাকে আইনে পরিণত করার দাবি আর কতদিন পড়ে থাকবে? উন্নত বিশ্ব তো বটেই, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও আমরা দেখছি কীভাবে গৃহকর্মীদের মজুরি, শ্রমঘণ্টা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ বিষয়েও গড়ে উঠেছে সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা। বাংলাদেশে আমরা আর কতদিন কেবল আলোচনা ও সভা-সেমিনারই করে যাব? দেশের অন্যতম প্রধান অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতটি, যেখানে উল্লেখযোগ্য অংশ শিশুসহ কমবেশি ২০ লাখ জনশক্তি নিয়োজিত, তা এভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। তবে সবকিছুর আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা ও মর্যাদা। রেখা বেগমের মতো গৃহকর্মীদের 'অস্বাভাবিক' মৃত্যু আমরা যতদিন ঠেকাতে না পারছি; যতদিন তাদের প্রাণহানির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়িদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারছি; ততদিন তাদের জন্য 'স্বাভাবিক' মর্যাদা অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুদূর পরাহতই থেকে যাবে।

বিষয় : সম্পাদকীয় মর্যাদা ও মানবিকতা

মন্তব্য করুন