শোকাবহ ১৫ আগস্ট এসে গেল। ৪৭তম ১৫ আগস্ট। অর্থাৎ, ৪৭ বছর আগে আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, বঙ্গবন্ধু হারিয়েছেন তাঁর প্রিয় বাংলাদেশ ও দেশের জনগণকে। সেই থেকে আজতক সম্ভবত বঙ্গবন্ধু জানতেই পারছেন না হালের বাংলাদেশ কেমন চলছে, কেমন আছে তাঁর প্রিয় জনগণ।

অপর পক্ষে বছর কয়েক হলো আমরা আগস্ট মাসজুড়ে এবং তার আগে কিছুকাল সপ্তাহব্যাপী এবং তারও আগে ১৫ আগস্ট এক দিনের জন্য জাতীয় শোক দিবস পালন করে আসছি- ধারণ করছি কালো ব্যাজ, ঊর্ধ্বে তুলে ধরছি কালো পতাকা, আয়োজন করছি আলোচনা বা স্মরণসভার। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড দেশজুড়ে বাজানো হচ্ছে। এভাবেই পালন করে আসছি জাতীয় শোক দিবস বা শোক সপ্তাহ এবং অতঃপর প্রায় এক যুগব্যাপী শোকের মাস।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর অবদান বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশ- এটাই যেন প্রাধান্য পাচ্ছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক অবদানকে (যা হলো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অবদান) সে আলোচনায় আমরা আদৌ স্থান দিতে দেখি না। তাই যে প্রত্যয় ১৫ আগস্ট বা আগস্ট মাসজুড়ে ঘোষিত হওয়ার কথা, তা আজ প্রায় বিস্মৃত। সে স্থলে উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে আমরা তাঁর নাম উচ্চারণ করি।

১৯৪৮ ও ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন দেশে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়- শিক্ষিত জাতি গড়তে বাংলা ভাষার সর্বাত্মক ব্যবহারের গুরুত্ব ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। দেশ সে পথে চলছিলও। কিন্তু কী দিয়ে কী হলো তা বুঝে ওঠার সময় পেতে না পেতেই খোন্দকার মোশতাক এবং অতঃপর জিয়া ও তারপর স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতায় এসে তাঁদের অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে নানাভাবে ধর্মের জিকির তুলতে শুরু করলেন। জিয়া বাহাত্তরের সংবিধানে অবৈধভাবে পঞ্চম সংশোধনী এনে 'বিসমিল্লাহ্‌' সংযোজন করলেন, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোকে বৈধতা দিলেন। আজকের আওয়ামী লীগও এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলছে; যদিও বঙ্গবন্ধু, তুমি বাহাত্তরের সংবিধানে এগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলে। জিয়া তা মানেননি। মোশতাক তোমাকে 'ইসলামবিরোধী' বলে আখ্যায়িত করেছিল। জিয়া ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র তুলে দিয়েছিলেন ৭২-এর সংবিধান থেকে।

২০০৮ সালে এসে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারও গঠন করে, কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশের অনেক বেশি আসন সেবার এবং পরবর্তী সময়ে দু'বার অর্জন করলেও উপেক্ষার শিকার হয়েই রইল বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনরুজ্জীবনের দাবি এবং প্রতিশ্রুতি।


বঙ্গবন্ধু! পরপর তোমার দল তিনবার নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করলেও তোমার চেতনা ও আদর্শকে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করল না। উপরন্তু অষ্টম সংশোধনীর দ্বারা যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করলেন, গুলি করে ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিক নেতাদের যাঁর রাজত্বকালে হত্যা করা হলো, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাদের যিনি একটি বৈঠক থেকে ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চোখ বেঁধে নিয়ে যেতে দ্বিধা করেননি, তাঁর প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখা হলো। শুধু তাই নয়, স্বৈরাচারী বলে পরিচিত এরশাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন দুর্নীতির মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়ে তাঁকে আওয়ামী লীগের মিত্র বানিয়ে তাদের এমপি, মন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতৃত্বের পদও বিস্ময়করভাবে দেওয়া হয়। এতে মানুষের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়।

কিন্তু অকস্মাৎ একটি মস্ত সুযোগ আসে। একটি মামলার বিচার করতে গিয়ে হাইকোর্ট জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং তাঁদের আনা পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনীকে বেআইনি ও সংবিধানবিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হলে উভয়পক্ষের শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশ্রয়ী সব মহল উৎসাহিত। জামায়াতের নেতাকর্মীরা সারাদেশেই অফিস ছেড়ে ভয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা সরকারকে উপদেশ দেন, 'অবিলম্বে ওই রায়ের মর্মানুযায়ী পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী বাতিল করা হলো' মর্মে একটি গেজেট ও প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক।

কিন্তু না, তা করা হলো না। উল্টো সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে ওই দুটি সংশোধনীর অনেক ধারাকে বৈধতা ও স্থায়িত্ব প্রদান করা হয়।

বাড়তি যা পাওয়া গেল তা হলো, শফি হুজুর এবং তাঁর ঘোরতর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী 'হেফাজতে ইসলাম'। এরা প্রকাশ্যে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে এক বিশাল সমাবেশে ঢাকায় বলেছিলেন, হাসিনা সরকার ইসলামবিরোধী সরকার। তাকে উৎখাত করা হবে। অতঃপর কিছুকাল ধরপাকড় চলল, কিন্তু কিছুদিন পরেই সব ঠান্ডা। শফি হুজুর হলেন সরকারের বন্ধু।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও ঘটেই চলেছে বঙ্গবন্ধু তোমার রেখে যাওয়া বাংলাদেশে। এমন অসহনশীলতা ধর্মের নামে অতীতে কদাপি ছিল না বাংলাদেশে। তুমি স্বয়ং এর সাক্ষী। কারণ হেফাজত ছিল না, জামায়াতও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তখনও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা অনেক ঘটেছে, কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগ মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং বামপন্থি ছাত্র ইউনিয়ন, যুবলীগ প্রভৃতি সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে মিছিল বের করতেন। মিছিল দেখে দাঙ্গাকারীরা ভয়ে পালিয়ে যেত- রক্ষা পেত হিন্দুদের জীবন, বাড়িঘর ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু আজকের আওয়ামী লীগ? তখন তো বঙ্গবন্ধু তোমার আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল এবং অপরাপর সমমনা বিরোধী দলের কর্মী ও নেতারা মিছিল করে দাঙ্গা থামাতে পারতেন, কিন্তু আজকের আওয়ামী লীগ একটানা বহুদিন ক্ষমতায় এবং তোমার নাম ব্যবহার করেই দলটি চলছে। এখন তাদের হাতে বিশাল ছাত্রলীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, পুলিশ, র‌্যাব, মিলিটারি, অঢেল টাকা প্রভৃতি। কিন্তু দলটি সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের শাস্তি দেয় না, বরং ভুক্তভোগী কাউকে কাউকে ডিজিটাল আইনে জেলে আটক করে রেখে দেয়। ফলে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হতাশায় মুষড়ে পড়েন।

আজ প্রতিদিন বহু মানুষ সড়ক, রেল ও অপরাপর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। নারীর জীবন চরম অনিশ্চিত। বিশেষ করে বিবাহিত-অবিবাহিত যুবতীদের পথচলা নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় তাদের পক্ষে বাসে, ট্রেনে বা স্টিমারে চলাফেরা- বিশেষ করে রাতে।

বঙ্গবন্ধু, আজ পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সমাজতন্ত্র পরিত্যক্ত; যদিও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার, যা উন্নয়ন ঘটছে তা চোখ ঝলসানো হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজে লাগছে না। বরং ওই সব মেগা উন্নয়ন প্রকল্প হাজার হাজার কোটিপতি ও কালো টাকার মালিকের জন্ম দিচ্ছে। তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশে আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী। দু'বেলা পেটপুরে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমন একটি বাংলাদেশ তো তোমার বা সংগ্রামী বাঙালি জাতির কাম্য ছিল না।

রণেশ মৈত্র: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
raneshmaitra@gmail.com