ঢাকা ওয়াসার বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে সংস্থাটির এমডি বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের কাছে পানির দর ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করেছেন তা আমাদের শুধু বিস্মিতই করেনি, উদ্বিগ্নও করেছে। আমরা বিস্মিত হয়েছি, কারণ গত ১৭ মে রাজধানীতে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশনের দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাটির বোর্ড সরকারের কাছে পানির দর ৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। ওই সিদ্ধান্তের পর দু'মাসও যায়নি; এর মধ্যে কী এমন পরিস্থিতি হলো যে বোর্ডকে না জানিয়ে ঢাকা ওয়াসার এমডি নিজেই পানির দর একেবারে এক লাফে ২৫ শতাংশ বাড়ানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন? শুক্রবার সমকালের এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন মতে, সংস্থাটির বোর্ড চেয়ারম্যান বলেছেন, পানির দর একসঙ্গে ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর ক্ষমতা বোর্ডের নেই; এ ক্ষমতা কেবল সরকারের হাতেই আছে; তাই হয়তো এমডি এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে তিনি কী এমন প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠাতে পারেন? সরকারেরও কি বোর্ডের সম্মতিহীন কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ আছে? আমরা তা জানি না; তবে এ ঘটনায় এটা স্পষ্ট যে, ওয়াসা এমডি এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হয়েছেন; আর সরকার ওই প্রস্তাবে সায় দিলে বুঝতে হবে তাদের আশকারা পেয়েই এমডি বোর্ডকে অকার্যকর করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। আমাদের উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই। সংস্থাটির কর্মকাণ্ডে জনস্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয় তা দেখভালের জন্যই ওয়াসার বোর্ডে জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকেও রাখা হয়। অর্থাৎ বোর্ডের মাধ্যমে সংস্থাটির কার্যক্রমে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন এমডিকে যদি বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সেখানে যাই হোক জনস্বার্থের সুরক্ষা থাকবে না।

পানির দর ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে ওয়াসা এমডি যেসব হাস্যকর যুক্তি দিয়েছেন তাও তার ওই স্বেচ্ছাচারী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেছেন, ঢাকায় বর্তমানে প্রতি ইউনিট বা ১ হাজার লিটার পানির দাম আবাসিকে ১৫ টাকা ও বাণিজ্যিকে ৪২ টাকা হলেও সিউলে তা ৮৬ টাকার বেশি, ম্যানিলায় প্রায় ১৯০ টাকা ও লন্ডনে ২৭৯ টাকা। কিন্তু ওই দেশগুলোর সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর সেবার মান ওয়াসা থেকে কতটা উন্নত তা তিনি বলেননি। ওই সংস্থাগুলোর সরবরাহকৃত পানিতে এখানকার ইকোলাই ব্যাকটেরিয়ার মতো কোনো জীবাণু কতটুকু পাওয়া যায় তাও তিনি পরিস্কার করেননি। আর সেখানকার জনগণের মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে কতটা বেশি তাও বলা হয়নি। তিনি যেন ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই কিল মারার গোঁসাই। বলা বাহুল্য, ঢাকা ওয়াসার পানির দাম চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার চেয়ে বেশি এবং এর কারণ হলো দুর্নীতির পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ- যে ঋণের প্রকল্পের সুবিধা মানুষ না পেলেও কিস্তি দেওয়া হয় বর্ধিত পানির দাম দিয়ে।

আমাদের উদ্বেগের আরেকটা কারণ হলো, ওয়াসার পানির দর বৃদ্ধির এ প্রস্তাব এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছে যখন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষরা একদিকে দফায় দফায় চাল-ডাল-তেলসহ সব নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়ছে; আরেকদিকে সব ধরনের জ্বালানির তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়সহ জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শুধু তা নয়, সরকার আরেক দফা গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবার দাম বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। মনে রাখতে হবে, এসব নিত্যপণ্য ও মৌলিক সেবার দাম যখন বাড়ছে তখন দুই বছরের করোনা মহামারির তাণ্ডবে অনেকে জীবিকা হারিয়েছে, অনেকের বেতন কমে গেছে এবং অনেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে টিকতে না পেরে পরিবার-পরিজন গ্রামে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে আরেক দফা পানির দাম বৃদ্ধি হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। আমাদের প্রত্যাশা, ওয়াসা এমডির ওই প্রস্তাব সরকার শুধু ফিরিয়েই দেবে না, বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে তিনি যেন কখনোই এমন কাজ করতে না পারেন তার ব্যবস্থাও করবে।

বিষয় : সম্পাদকীয় দাম বেশি ঢাকা ওয়াসা

মন্তব্য করুন