খ্যাতিমান অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৯৩ সালে 'নিসচা' তথা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষের পর অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন দু'বার। সমাজসেবায় অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ করেন ২০১৭ সালে। ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্ম ১৯৫৬ সালে, কিশোরগঞ্জে।

সমকাল: স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কতটা সফল হয়েছেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন: ২৮ বছর আগে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেই আন্দোলন শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে অনেক সরকার দেখলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কোনো সরকারই আন্তরিক ছিল না। সরকার আন্তরিক হলে সুফল বেশি পেতাম। প্রতিদিন সড়কে এত মানুষের মৃত্যু হতো না; এত মানুষ স্বজনহারা হতো না; পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করত না।

সমকাল: সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে রোধ করা যেতে পারে?

ইলিয়াস কাঞ্চন: ২৮ বছরে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছি। জাতিসংঘ, গ্লোবাল রোড সেফটিসহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যাঁরা সরকারে থাকেন তাঁদের ইচ্ছার ওপর সড়ক দুর্ঘটনা রোধ নির্ভর করে। যে সরকার এ বিষয়ে যত বেশি কাজ করবে, সড়ক দুর্ঘটনা তত কম হবে।

সমকাল: সরকার সড়ক পরিবহন আইন করলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না...

ইলিয়াস কাঞ্চন: মূল কারণ পরিবহন খাতের মালিক পক্ষের অসহযোগিতা। আইন বাস্তবায়ন হোক, তারা চায় না। সরকারেরও দৃঢ়তা দেখছি না। আইন বাস্তবায়ন করতে হলে পরিবেশ ও কারিগরি কিছু দিক সামনে আসে। সড়ক আইনে বলা আছে, স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকবে। কোনো চালক অপরাধ করলে বা আইন অমান্য করলে ডিজিটালি তাঁর মার্ক কাটা যাবে। কিন্তু এখনও স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করা হয়নি। দণ্ডবিধি তৈরি হওয়ার কথা। সেটা হয়েছে কিনা, আমরা এখনও জানতে পারলাম না। সরকারের পরিপূর্ণ সদিচ্ছা থাকলে এটি এত দিনে বাস্তবায়িত হতো। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সদিচ্ছা দেখছি না।

সমকাল: আপনারা বিভিন্ন সময় চালকের যোগ্যতার প্রশ্নেও কথা বলেছেন।

ইলিয়াস কাঞ্চন: চালকদের যথাযথভাবে তৈরি করতে যে ধরনের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা দরকার, তা আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। চালকরা এখানে গাড়ি ডানে-বামে চালাতে পারলেই যোগ্যতা মনে করা হয়। আমাদের দেশে চালকের সঙ্গে সহকারী থাকে। ওস্তাদ আর সাগরেদের সম্পর্ক। এই সহকারী তার চালকের সঙ্গে থেকেই একসময় চালক হয়ে যায়- এ রেওয়াজ থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। পৃথিবীতে আর কোথাও এ পদ্ধতিতে চালক তৈরি করা হয় না। একজন চালকের আবহাওয়া, রাত-দিন, গতি, শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়। চলন্ত অবস্থায় ধূমপান বা গান শোনা যাবে না। এর বাইরেও খেয়াল রাখতে হয়, গাড়িতে এমন কিছু আছে কিনা, যেটা চালকের মনোযোগ অন্যদিকে টানতে পারে। একটা দুর্ঘটনা কতটা ক্ষতি ডেকে আনে; সার্বিক বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দরকার।

সমকাল: সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে জনসচেতনতার বিষয়টিও তো গুরুত্বপূর্ণ।

ইলিয়াস কাঞ্চন: শতভাগ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এ কাজটিই শুধু করি। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। ছাত্র, জনসাধারণ এমনকি চালকদের বলি, নিজেদের জীবন নিজেরা রক্ষা না করলে কেউ এগিয়ে আসবে না। এসব বিষয়ে আমরা চালকদের প্রশিক্ষণ দিই। একসময় আমরা সব বাস টার্মিনালে গিয়ে এই প্রশিক্ষণ দিতাম। এখন আর বড় টার্মিনালে যেতে পারি না। কারণ মালিকরা আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। তারপরও ছোট টার্মিনালে যাচ্ছি, প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

সমকাল: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরাও বারবার আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদেরই বারবার নামতে হচ্ছে কেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন: বিভিন্ন সময় সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলছে, ধাক্কা দিতে হবে। পরিবহন বিভাগ বারবার সরকারকে ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা না দিলে তারা নড়বে না। যখন মালিকপক্ষ তাদের স্বার্থে সরকারকে ধাক্কা দেয়, তখন যাত্রীদের পক্ষ থেকে যদি সরকারকে পাল্টা ধাক্কা দেওয়া না হয়, তাহলে জনস্বার্থ উপেক্ষিত থেকে যায়। এই ধাক্কা দেওয়ার জন্য শুধু ছাত্রদের নামিয়ে তামাশা দেখলে হবে না। জনগণকেও রাস্তায় নামতে হবে। তবে আমাদের দেশে ছাত্র আন্দোলনের সফল ইতিহাস রয়েছে। তাঁরা নামলে ধাক্কা দেওয়ার শক্তিটা বেড়ে যায়। সঙ্গে জনগণ নামলে সেই আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।

সমকাল: সম্প্রতি চট্টগ্রামে মাইক্রোবাস ও রেলের সংঘর্ষে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে কেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন: রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার জন্য শুধু রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। সড়কপথের যানবাহন ও পথচারীরাও অনেকাংশে দায়ী। অনেক যানবাহন সিগন্যাল অমান্য করে রেলক্রসিং পার হওয়ার পাল্লা দেয়। পথচারী কেউ কেউ কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে বেখেয়ালভাবে হাঁটে। অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধ করতে হবে। যেখানে পাহারাদার নেই, সেখানে নিয়োগ দিতে হবে। সড়ক বিভাগ ও রেল বিভাগের সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সড়ক হচ্ছে; রেলক্রসিং হচ্ছে। সড়ক বিভাগ ও রেল বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতায়ও দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে।

সমকাল: আমাদের দেশের সড়ক অবকাঠামো দুর্ঘটনা রোধে কতটা উপযোগী?

ইলিয়াস কাঞ্চন: ভালো প্রশ্ন করেছেন। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিনও বিষয়টি আমার মাথায় বারবার আসছিল। ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়ক চার লেন সম্পন্ন না করে সেতু উদ্বোধন কি পরিপূর্ণ হলো? স্যুট-টাই পরালাম, কিন্তু প্যান্ট পরানো হলো না। তাহলে কি সুন্দর লাগবে? আমাদের দেশে উড়াল সেতুতে সিঁড়ি দেওয়া হয়। অথচ আন্তর্জাতিক মান কী বলে? উড়াল সেতুর ওপর কোনো গাড়ি থামবে না। তাহলে সিঁড়ি কেন দেওয়া হলো? এক্সপ্রেসওয়ে বানানো হয়েছে। কিন্তু বাস থামিয়ে যাত্রী ছাউনি থেকে যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে। ফুট ওভারব্রিজ নেই, তাহলে যাত্রীরা সড়ক পার হবে কীভাবে? বলা হয়, বরাদ্দ নেই; পরে বানাব। এটা তো পদ্ধতি না। কিন্তু এসবই হচ্ছে। আর দুর্ঘটনা রোধ দূরে থাক, আমাদের দেশের সড়ক অবকাঠামো বরং দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ইলিয়াস কাঞ্চন: সমকালের জন্য শুভকামনা।