জন্মনিবন্ধন নিয়ে দেশে যা চলছে, তাকে হতাশাজনক বললে ভুল বলা হবে না। ২০০৬ সালে যখন তা শুরু হয়, তখন থেকেই এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল। ম্যানুয়ালি করার সুযোগ থাকায় তখন নাম পাল্টিয়ে একজন শিশুর জন্মনিবন্ধন একাধিকবার করা যেত। ফলে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে একটা হযবরল অবস্থা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে সংশ্নিষ্ট আইনে সংশোধন এনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিবন্ধন শুরু হয়। কিন্তু তাতে সৃষ্টি হলো আরেক ভোগান্তিত; শিশুর জন্মনিবন্ধনের জন্য চাওয়া হয় মা-বাবার জন্মনিবন্ধন সনদ। দেখা গেল, কোনো শিশুর বাবা আছে, মা নেই কিংবা মা আছে, বাবা নেই। আবার কারও কারও বাবা-মা বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা সংসার করেছে। কয়েক লাখ পথশিশুর বেলায় দেখা গেল আরেক জটিলতা। কারণ, তারা শুধু অভিভাবকহীনই নয়; বাড়িঘর অর্থাৎ ঠিকানা বলতে তাদের কিছুই নেই। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে এর কোনো সমাধান না পেয়ে তখন একটি শিশু অধিকার সংগঠনকে আমরা উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করতে দেখেছি। এদিকে ২০২১ সালে দেখা গেল, যেসব শিশু ও তাদের বাবা-মা ২০১১ সালের আগে ম্যানুয়ালি নিবন্ধিত হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগের নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল তালিকায় তোলা হয়নি। ফলে কয়েক কোটি মানুষকে নতুন করে জন্মনিবন্ধনের চেষ্টা করতে হয়েছে। সর্বশেষ খবর হলো, মানুষের এসব ভোগান্তি কমাতে নিবন্ধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার পরও শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

এখানে বলে রাখা দরকার, জন্মনিবন্ধন সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক করে আইন করা হয় ২০০৪ সালে। আইনে শিশু জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং স্কুলে ভর্তি, এসএসসি পরীক্ষার নিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদনসহ ১৮টি সেবার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে একদিকে মানুষের মধ্যে জন্মনিবন্ধন বিষয়ে এক ধরনের হুড়োহুড়ির প্রবণতা তৈরি হয়; অন্যদিকে এ পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন নিবন্ধনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গজিয়ে ওঠে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু এখনও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সম্যক পরিচিত নয়, তাই ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়া ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর থাকে না। শুধু তাই নয়; যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার দায়িত্ব পেল; দেখা গেল তাদের আর সেবাগ্রহীতার মধ্যে এক দল দালাল গড়ে উঠল। দাদের কাজ হলো পয়সার বিনিময়ে জন্মনিবন্ধন সনদ পাইয়ে দেওয়া। আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, জনগণকে এসব দুর্ভোগ থেকে নিস্কৃতি দেওয়ার কথা বলে রেজিস্ট্রার জেনারেল জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে ১ আগস্ট যে নির্দেশনা জারি করেছেন, তা নিয়ে কোনো প্রচার না থাকায় জনগণ এই 'সহজ' প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছুই জানে না। আবার যাঁরা তা জানেন, তাঁরা এ প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন করতে গিয়ে আগের মতোই ডিজিটাল জটিলতায় পড়েছেন। এমনকি এ বিষয়ে জনগণের অভিযোগ যাচাই করতে গিয়ে সমকাল প্রতিবেদকও দেখেছেন, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে জন্মনিবন্ধন লিঙ্কে বহু চেষ্টার পরও ঢোকা যায় না। বাধ্য হয়ে তাঁদের নিবন্ধন সনদ পেতে ওই দালালচক্রেরই দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

বিস্ময়কর হলো, প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার জেনারেল এ জটিলতা বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দিতে পারেননি। তিনি একবার এর জন্য তাঁর কার্যালয়ের জনবল সংকটকে দায়ী করেছেন; আরেকবার সার্ভারের দুর্বলতাকে দায়ী করে বলছেন, সার্ভারের আধুনিকায়ন করা হলে সমস্যাটি মিটে যাবে। এতে বোঝা যায়, হয় সরকারি এ সংস্থা সব নাগরিকের জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার গুরুত্বটি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি, অথবা তাদের অসাধু কর্মচারীদের সুবিধা করে দিতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াটি সহজ করতে চাইছে না। কারণ যা-ই হোক, তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে তার সব নাগরিকের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে; রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুবিধাগুলো প্রকৃত নাগরিকদের হাতে পৌঁছাতে এবং সেসব সুবিধার অপচয় রোধের জন্যই তা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার অবিলম্বে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়ার সব জটিলতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

বিষয় : হযবরল সম্পাদকীয় জন্মনিবন্ধন

মন্তব্য করুন