পাকিস্তান স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপন করেছে ১৪ আগস্ট। এ উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন, রাজধানীতে বাজি প্রদর্শন এবং নতুন ৭৫ রুপির নোট উদ্বোধন ছাড়া দেশটির তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যদিও ৭৫ রুপি দিয়ে আগে যা কেনা যেত, এখন তা কেনা যায় না। গত সপ্তাহের মূল্যস্ম্ফীতির হিসাব বলছে, গত বছরের তুলনায় পাকিস্তানের দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ২৫ শতাংশ। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও বিদ্যুতের দামও ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতির সংকটে দেশটির নতুন সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। সে জন্য পাকিস্তান প্রশাসন বৈদেশিক ঋণ বিষয়ে খেলাপি হওয়া ঠেকাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহায়তা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনকারী পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসাইন হক্কানি ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট কয়েক দশকের কাঠামোগত সমস্যায় গ্রোথিত। তাঁর মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিকদের লুণ্ঠনের কারণে আরও গভীর হচ্ছে।
পাকিস্তান অনেক পণ্য ও সেবার জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আমদানি-রপ্তানির গ্যাপ কমাতে সেখানে শিল্পের যথেষ্ট সম্প্রসারণ ঘটেনি। ট্যাক্স-জিডিপি ও রপ্তানি-জিডিপির হারে বিশ্বের সবচেয়ে নিম্নসারির দেশের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান। এর অর্থ হলো, সেখানকার সরকার ক্রমাগত রাজস্বস্বল্পতায় পড়ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেনে দীর্ঘ সংকট মোকাবিলা করছে। হুসাইন হক্কানি, যিনি বর্তমানে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক হাডসন ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পরিচালক; তাঁর মতে, 'পাকিস্তানের নেতারা অর্থনীতির মৌলিক বিষয়াবলি বাদ দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।'
তবে দেশটি যে সবসময়ই এমন ছিল, তা নয়। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ কাইসার বেঙ্গলি বলছেন, পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পদ অর্জন করে। ২০০০ সালের দিকে পাকিস্তান সরকার বৈদেশিক স্বার্থে কাজ করা শুরু করে। সে সময় রাজস্ব আয়ের চেয়ে ব্যয় এবং রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেড়ে যায়। আর এ ফারাকটা পূরণ করা হয় বৈদেশিক ঋণ নিয়ে। সেই ঋণের ফলেই সংকট বাড়ছে; কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য নয়।
কম রাজস্ব আহরণ মানে সাধারণ মানুষের সুযোগ ও সম্পদ সীমিতকরণ। আর সেটাই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে। এপ্রিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তিন বছর দায়িত্ব পালনের মধ্যেই অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে অনাস্থা ভোটে হেরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। ইমরান খানের উত্তরসূরি শাহবাজ শরিফ ভাঙা নীতি ও সমস্যাসংকুল অর্থনীতি নিয়ে কষ্টসাধ্য যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। শরিফ সরকার ঋণ সহজকরণে আইএমএফের সঙ্গে দর কষাকষি করছে বলে জ্বালানি তেলের ওপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে দিয়েছে, যাতে রাজস্ব কিছুটা বাড়ে। তাঁর সমালোচকরা বলছেন, তিনি বৈদেশিক দাতাদের সুবিধার জন্য সাধারণ পাকিস্তানিদের বিক্রি করছেন।
কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সামরিক বাহিনী ছড়ি ঘোরাচ্ছে এবং সরকারের দুর্নীতির ব্যাপারে জনগণকে উত্তেজিত করতে ভূমিকা পালন করছে। ইমরান খানের বিরোধীরা অভিযোগ করেছিলেন, ইমরান খান সেনাবাহিনীর 'পুতুল'। যদিও ইমরান খানকে ক্ষমতায় আনার জন্য ২০১৮ সালের নির্বাচনে সামরিক বাহিনী কারচুপি করেছিল বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, তা সেনাবাহিনী এবং ইমরান খান উভয়েই অস্বীকার করেন।
সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক মালিহা লোদি ডয়চে ভেলের কাছে অভিযোগ করেছেন, দেশটির প্রশাসনে সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক সরকার চক্রাকারে আসার কারণে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। সে কারণে পাকিস্তানের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নির্বাচিত এবং অনির্বাচিত সরকার এভাবে ক্ষমতায় আসার ফলে উত্তরাধিকারের দিক থেকেও সংকট সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, শীতল যুদ্ধের সময় এবং তার বাইরেও পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের প্রভাবে পাকিস্তান এ অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক খেলার অংশ হওয়ার ফলেও দেশটির শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশ্নেষক হক্কানি বলেছেন, চারটি সামরিক স্বৈরশাসন এবং রাজনৈতিক শাসনেও পর্দার আড়াল থেকে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কে এক ধরনের তিক্ততার পরিবেশ তৈরি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব কখনোই বেসামরিক রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করেনি। এমনকি রাজনীতিবিদরা 'দেশের স্বার্থে' কোনো কাজ করলে সেখানেও সামরিক বাহিনীর অবিশ্বাস। সে জন্যই পাকিস্তান সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে বিচারিক ও সামরিক ক্যুর মাধ্যমে বেসামরিক নেতৃত্বকে উৎখাত করেছে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত দুটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে ১৪ আগস্ট ও ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আচরণের নীতি গ্রহণ করে পাকিস্তান। পাকিস্তানের বৈদেশিক নীতি ও কূটনীতি এক আদর্শের বৃত্তে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে দেশটি তার প্রতিবেশী বৃহত্তর রাষ্ট্রের সমশক্তি হতে চেষ্টা করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়া এবং এমনকি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল। এ সবেরও মূল কারণ ছিল ভারত। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয় এবং অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধিও অর্জন নয়; ভারতই ছিল এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মূল কারণ। পাকিস্তানিরা বলছে, তাদের সরকার ব্রিটিশ দখল থেকে মুক্তির দিনটিকে উদযাপনের ব্যাপারে ভারতের চেয়ে কম উৎসাহী। ভারতে গত কয়েক মাস ধরে স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপন করা হচ্ছে।
কথা হলো, এই অবস্থান থেকে পাকিস্তান কোথায় যাবে? যদিও ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান উন্নয়নের দিক থেকে বেশ ভালো এগিয়েছে, কিন্তু আগামী ৭৫ বছর আরও চ্যালেঞ্জিং হবে বলেই প্রতীয়মান। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছাড়াও পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। অস্বীকার করার উপায় নেই- পাকিস্তানের মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসছে। সেখানে শিল্প ও কৃষির তাৎপর্যপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। মধ্যবিত্ত পাকিস্তানের উন্নয়নে নানাভাবে অবদান রাখছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সামরিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও বংশপরম্পরায় রাজনীতি নতুন দলের আগমনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা দেশকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অস্থিতিশীল করছে।
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি শাসক অভিজাতদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা করেছে। তাতে বৃহত্তর সমাজ ও সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। সরকারগুলো মানবসম্পদ গড়তে প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেনি। তবে শক্তিশালী নাগরিক সমাজ গঠন এবং দেশকে প্রগতিশীল পথে আনতে আশার জায়গা হলো- পাকিস্তানি তারুণ্য এবং পাকিস্তানিদের প্রয়োজন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও আদর্শিক আখ্যানের বাইরে গিয়ে মানবসম্পদ তৈরি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণে নজর দেওয়া।
হারুন জানজুয়া: ডয়চে ভেলের পাকিস্তানি সাংবাদিক; ডিডব্লিউ ডটকম থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক