স ম্প্রতি ভারতের আসামের ব্রহ্মপুত্র ভ্যালির চা বাগান শ্রমিকদের দৈনিক নূ্যনতম মজুরি ২৩২ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৭৭ টাকা। আর আসামের বরাক ভ্যালির চা শ্রমিকদের নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ২১০ রুপি বা ২৫০ টাকা। এর আগে গত জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ২৩২ রুপি বা ২৭৭ টাকা করা হয়।
এদিকে বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন দৈনিক নূ্যনতম মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে। ১২০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৯-২০ সময়ের জন্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চুক্তির ওপর ভিত্তি করে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। প্রথা অনুযায়ী নতুন চুক্তির মাধ্যমে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯ মাস পার হয়ে গেলেও সেই মজুরি বৃদ্ধির চুক্তি হয়নি। এখন আন্দোলনের কারণে মালিকপক্ষ মাত্র ১৪ টাকা মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিচ্ছে। ওই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলেই চা শ্রমিক ইউনিয়ন ১৬৭টি চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করছে।
কারও যদি কর্মসংস্থান থাকে তাহলে তাঁকে আর যা-ই হোক অন্তত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতে হবে না- উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমন মনে করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই সূত্রটা খাটে না। এখানে সারাবছর কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকের অভাব ঘুচবে না। চা শ্রমিকরা এর 'আদর্শ' উদাহরণ। একদিকে মজুরি কম, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় অবিশ্বাস্য মাত্রায় বেশি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, চা শ্রমিকদের দৈনিক মাত্র ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে কাজ করানো যায়! তাহলে শ্রমিকরা এখানে কাজ করেন কেন? বাস্তবতা হলো, কয়েক প্রজন্ম ধরে যাঁদের জীবন চা বাগানের লেবার কলোনিতে বাঁধা, তাঁদের জন্য ভিন্ন কাজে চলে যাওয়া সহজ নয়। প্রজন্মান্তরে দেড় শতাব্দীর বেশি বসবাস করলেও লেবার লাইনের ঘরগুলোতে তাঁদের মালিকানা নেই। চা বাগানে কাজ না করলে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকবে না। অনেকটা সামন্ত যুগের ভূমিদাসদের মতোই তাঁরা যুগ যুগ বাঁধা পড়ে আছেন।
বাগান মালিকরা দাবি করেন- শ্রমিকদের বাসস্থান, রেশন ও স্বাস্থ্য সুবিধার মূল্য হিসাব করলে প্রকৃত মজুরি ১২০ টাকার চেয়ে অনেক বেশি হবে। অন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্য হলো, সপ্তাহে শ্রমিক পরিবারপ্রতি যে ৭-৮ কেজি রেশনের চাল বা আটা দেওয়া হয়; যে ছোট্ট কুঁড়েঘরের অমানবিক পরিবেশে তাঁদের থাকতে দেওয়া হয় এবং যে সামান্য স্বাস্থ্যসেবা মেলে; এর মূল্য যোগ করলেও মজুরি দৈনিক ২০০ টাকার বেশি হবে না। এটা বাংলাদেশের যে কোনো খাতের নূ্যনতম মজুরির থেকে কম; মানবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্যও যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন মেলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের এক জরিপ থেকে। এ জরিপ অনুযায়ী, সিলেটের চা বাগানের প্রায় ৭৪ শতাংশ শ্রমিক এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়; ২৭ শতাংশ শীর্ণকায় এবং স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আসলে যে পরিস্থিতি, তাতে শতভাগ শ্রমিক পরিবারেরই দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকার কথা। কোনো কোনো শ্রমিক পরিবারের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা থাকায় কিছু শ্রমিক পরিবার হয়তো দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পেরেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা এ রকম- ভালো ফলনের জন্য চা গাছ ছেঁটে ছেঁটে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না। চা শ্রমিকের জীবনটাও ছেঁটে দেওয়া চা গাছের মতোই; লেবার লাইনের কুঁড়েঘরে বন্দি। একেকজন চা শ্রমিক সকালে লবণ দিয়ে এক মগ চা, সঙ্গে দু'মুঠো চাল ভাজা খেয়ে বাগানে যান। নিজের উৎপাদিত চাও দুধ-চিনি দিয়ে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। সারাদিন দাঁড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ২৩ কেজি পাতা তুললেই কেবল দিনের লক্ষ্যমাত্রা বা নিরিখ পূরণ হয়; হাজিরা হিসেবে গণ্য হয়। গাছ ছাঁটাইকালে অন্তত ২৫০টা গাছ ছাঁটতে হয় দিনে। কীটনাশক অন্তত ১ একর জমিতে ছিটালেই তবে নিরিখ পূরণ হয়। দুপুরে এক ফাঁকে মরিচ আর চা পাতার চাটনি, সঙ্গে মাঝেমধ্যে মুড়ি, চানাচুর।
একেক দিন হাত ফুলে যায়, পা ফুলে যায়; ঝোপালো চা গাছের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা, কোমর ছিলে যায়। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, সাপ-বিছার কামড় খেয়ে তাঁরা বাগানে কাজ করেন। সন্তানের শিক্ষা মেলে না; চিকিৎসা মেলে না; প্রজন্মান্তরে বসবাস করা ঘরটিও ধরে রাখতে হলে পরিবারের একজনকে অন্তত চা শ্রমিক হতেই হয়।
এই প্রেক্ষাপটে চা শ্রমিকদের দাবি সামান্যই- দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা; পরিবার নিয়ে বসবাস করার জন্য ৭৫০ বর্গফুটের পাকা ঘর; বাগানে ভূমির অধিকার; সন্তানের শিক্ষা, যথাযথ স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা, চাকরি স্থায়ীকরণ ইত্যাদি।
শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে, নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে 'জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ম্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের এবং সংশ্নিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা' করার কথা বলা হলেও এ জন্য কোনো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা দাঁড় করানো হয়নি। বরাবরই বরং বিভিন্ন সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষমতার জোর ও অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন খাতের নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। আর সামান্য মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের দিনের পর দিন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে হয়।
বাংলাদেশে অর্থনীতির উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যে জুটছে না। দেশের অর্থনীতির সুষম বিকাশের জন্য অবিলম্বে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানবিক জীবনযাপনের জন্য সব খাতের নূ্যনতম মজুরি নির্ধারণের কর্মকাঠামো দাঁড় করানো এবং এবং প্রতিবছর সে অনুযায়ী মজুরি সমন্বয়ের বিকল্প নেই।
কল্লোল মোস্তফা: লেখক, প্রকৌশলী, নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা