অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে- বাংলাদেশের প্রকৃত মন্দ ঋণ জ্ঞাত বা প্রকাশিত অঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি। এটিও আলোচনায় রয়েছে, কভিডকালে দেওয়া বিশেষ শৈথিল্য তুলে নিলে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসারে প্রদত্ত সিকিউরিটি ও কোলেটারেল পুনর্মূল্যায়ন করা হলে অঙ্কটি আরও বিরাট হতে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার সময় উত্তরাধিকারসূত্রে খেলাপি ঋণ পেয়েছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। একের পর এক আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারি এবং ঋণখেলাপিদের বারবার সুযোগ দেওয়ার পর সেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়।
২০১৯ সালে ব্যাংক খাত নিয়ে একটি রিপোর্টে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ বলেছিল, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়, প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার তুলনায় দুই বা তিন গুণ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের বৃদ্ধি পাওয়া সংখ্যারও দ্বিগুণ। অনেকে বলছেন, প্রকৃত বিচারে তা চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আইএমএফ ছাড়াও অনেকের মতে, বর্তমান সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কোনো কারণেই হোক, খেলাপিদের নানা সুবিধা দিয়েছে, যার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখা গেছে।
আমরা জানি, সাধারণত তিন মাস পরপর খেলাপি ঋণের তথ্য হিসাব করা হয়। সম্প্রতি জানা গেছে, শুধু গত প্রান্তিকেই ব্যাংক খাতে মন্দ বা খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৮১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা।
অনেকেই জানেন, করোনার কারণে ব্যাংক ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তা তুলে নেওয়ার পর ধাপে ধাপে এখন খেলাপি ঋণ বাড়তে শুরু করেছে। এর আগে গত জানুয়ারি-মার্চ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। পত্রিকাগুলো বলেছে, বিশেষ বিবেচনায় যেসব ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে, তা আবার খেলাপি হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি যেসব প্রণোদনা ঋণ বিতরণ হয়েছে, তাও খেলাপি হয়ে পড়ছে।
গত জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে খেলাপির হার প্রায় ২২ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা প্রদত্ত ঋণের ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অনেক বিশ্নেষকই বলছেন, করোনাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করার যে সুবিধা দিয়েছে, তা গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহী করে তুলেছে। গত দুই বছর ব্যবসায়ীরা ঋণ শোধ না করেও ব্যাংকের খাতায় ছিলেন ভালো গ্রাহক। এমনকি কভিডের কারণে সমস্যা নয় এমন গ্রাহকদের মন্দ ঋণও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদের পরামর্শে করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর যোগ দেওয়ার পর বড় ধরনের ছাড় দিয়ে নতুন এক খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নীতিমালায় আড়াই থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। আগে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে হতো। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ পাঁচ থেকে আট বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। আগে এসব ঋণ শোধ করতে সর্বোচ্চ দুই বছর সময় দেওয়া হতো। আবার নতুন করে ঋণও পাওয়া যাবে।


নতুন নীতিমালায় অবশ্য খেলাপি ঋণের সুবিধা প্রদান ও পুনঃতপশিলের ক্ষমতা সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংক মালিক বা ব্যাংকের বোর্ডই ঠিক করবে, কোন ঋণ পুনঃতপশিল সুবিধা পাবে। আগে ঋণ পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগত। এর ফলে যাঁরা খেলাপি ঋণ আড়াল করতে পারছেন, তাঁরা এটি আরও সহজে করতে পারবেন।
সুবিধা দেওয়ার নীতি অবশ্য এটাই প্রথম নয়। প্রায় ৪৫ বছর ধরে সব সরকার নানাভাবে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে আসছে। ফলে কখনোই দেশে খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তা ক্রমে বেড়েছে। ঋণখেলাপিরাও অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। খেলাপি ঋণের বৃহদাংশ কমসংখ্যক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। নীতিনির্ধারণেও তাঁদের প্রভাব আছে। তাঁদের একটি বড় অংশ নানা সুবিধা নিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে রাখতে পারছে। আবার বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎও করছে।
অর্থনীতিবিদরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসনের প্রচণ্ড অভাব এবং তার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এ খাতে বড় ধরনের সংস্কারও প্রয়োজন বলে তাঁদের অনেকে বারবার বলে আসছেন।
বর্তমানে প্রায় সবাই বলছেন, অর্থনীতি এখন নানা ধরনের ঝুঁকিতে। বেড়েছে মূল্যস্টম্ফীতি। সামাল দেওয়া যাচ্ছে না ডলার সংকট। অর্থের অভাবে ভর্তুকি বাড়াতে পারছে না সরকার। ফলে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বহু গুণ। এ দুঃসময়ের মধ্যে যাঁদের সুসময় যাচ্ছে, তাঁদের অন্যতম ঋণখেলাপিরা।
বলতে দ্বিধা নেই, খেলাপি হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়া গেলে ব্যাংক ঋণ আরও বাড়ানো যেত। বৃদ্ধি পেত বিনিয়োগ; তৈরি হতো কর্মসংস্থান; বাড়ত মানুষের আয়। পুরো অর্থবছরে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, তার চেয়েও প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। এমনকি বলা হচ্ছে, এ ঋণ দিয়ে চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো।
আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়েও রয়েছে অনেক বদহজম। অর্থনীতিবিদ তথা নীতি বিশ্নেষকদের কথা বাদ দিলেও নীতিনির্ধারক অনেকের কোনো ধারণা নেই- কী সংস্কার, কোথায় সংস্কার এমনকি কাদের নিয়ে বা দিয়ে সংস্কার? এই সংস্কার কি ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি- মূলধন কিংবা নিট মূলধনের ওপর জোর দেবে? নাকি ঋণের বিপরীতে জামানত বা প্রতিটি ব্যবসায়ের ভবিষ্যতের ওপর বা ঋণ গ্রহীতার কোম্পানির মূলধনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করে দেবে?
আমার মতে, সংস্কারকদের পরিস্কারভাবে বলে দিতে হবে- বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম কে চালাবে- বোর্ড, না পেশাজীবীরা? ভালো ব্যাংক আর খারাপ ব্যাংকের সঙ্গে পার্থক্যের মাপকাঠি কী হবে? ভালো ব্যাংকগুলোকে আমরা ভালো কাজে উৎসাহিত করবই বা কী করে?
সত্যিকারের সংস্কার করতে গেলে হয়তো আরব আমিরাত, বাহরাইন বা কাতারের মতো স্থানীয় ব্যাংকেও প্রধান নির্বাহী, পরিচালন কর্মকর্তা বা প্রযুক্তি প্রধান পদে পরীক্ষিত বিদেশি পেশাজীবীদের নিয়োগের পথ উন্মুক্ত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন আর প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর।
এটাও বলে রাখা সমীচীন, যতদিন কোনো ব্যাংকে ব্যাংকিং সময়ের পরও বিশেষ গ্রাহকের জন্য বিরাট অঙ্কের নগদ টাকা তোলা সম্ভব বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোটা অঙ্কের মেয়াদি আমানত দুর্বলতম ব্যাংকে আমানত রাখা সম্ভব, ততদিন কোনো সংস্কারই কাজ করবে না।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্নেষক