গত ৫ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উল্লিখিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই একাডেমির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত সর্বস্তরের শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষাদানকারী কলেজ ও মাদ্রাসা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। ইউজিসি সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মোটাদাগে পাঁচটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ স্টাডিজ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের মানুষের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে ওই 'বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি' প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক চিন্তা যেসব বিশিষ্টজন করেছেন, তাঁরা নিশ্চয় বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নের মহান লক্ষ্য থেকেই তা করেছেন। তবে এখানে কমপক্ষে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে- ১. প্রস্তাবিত একাডেমিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কোন দর্শন বাস্তবায়িত হবে? ২. এই প্রশিক্ষণ কারা দেবেন? তাঁরা কি বাংলাদেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকমণ্ডলী থেকে আসবেন, না আমলারা ওই প্রশিক্ষণ দেবেন? ৩. মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে গত ৫১ বছরেও একই ধরনের ও সর্বজনীন কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; এখানে বিরাজ করছে বহু ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমির মাধ্যমে শিক্ষার কোন ধারাটি উপকৃত হবে?
৪. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লিখিত চার জাতীয় মূলনীতির আলোকে দেশপ্রেমিক সুনাগরিক তৈরি ত্বরান্বিত হবে কি? এখন বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্নিষ্ট কিছু সমস্যার দিকে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাক।
ক. ইউজিসির ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবলিক ৫২, বেসরকারি ১০৮ এবং আন্তর্জাতিক ৩) রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পাস করে বেরোচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা লাখো ছাত্রছাত্রীর অর্জিত জ্ঞানকে আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি কি বা তাদের জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত কাজ দিতে পারছি কি? উত্তর- না। আসলে, এই লক্ষ্যহীন শিক্ষা দেশে শিক্ষিত বেকারের পাল্লাই ভারী করে যাচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশে যেসব পেশা বা বৃত্তি রয়েছে (বা ভবিষ্যতে সৃষ্টি হতে পারে), তাতে কী ধরনের যোগ্যতা ও গুণাবলিসম্পন্ন লোক প্রয়োজন, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার পর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেসব পেশা বা বৃত্তিভিত্তিক একাডেমিক বিভাগ চালু হলে ছাত্রছাত্রীদের অর্জিত জ্ঞান অধিকতর ভালোভাবে কাজে লাগানো এবং শিক্ষিত বেকারও পরিহার করা যেত।
খ. এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই, ইদানীং বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দক্ষতা নিম্নগামী। অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে তাদের সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে তালা লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ওই তাণ্ডবকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহায়ত্বই লক্ষ্য করা গেছে। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়; বাংলাদেশে যখন যে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের ছাত্র সংগঠন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে থাকে। ছাত্র নামধারী নেতাকর্মীরা তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য হল দখলের প্রতিযোগিতায় নামে এবং সাধারণ ছাত্রদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। এসব অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। অথচ প্রশাসনে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই; তাঁদের ভয় না করে মেরুদণ্ড সোজা করেই চলার কথা। এ রকমটির পেছনে মূল কারণ হচ্ছে, প্রশাসনিক দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের বিবেচনা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যদের নিয়োগদান। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছাত্রসুলভ আচরণ ফিরিয়ে আনতে চাইলে দলীয় আনুগত্য পরিহার করে অত্যন্ত নির্মোহভাবে শুধু দক্ষ ও সৎ লোকদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
গ. শুধু প্রশাসক নিয়োগেই নয়; ইদানীং সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতিতেও ব্যক্তিগত বা দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। বিদায়ের ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের শিক্ষক এবং প্রশাসনিক পদে অনৈতিকভাবে নিয়োগদানের অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব উপাচার্য। এখানে যোগ করা ভালো, শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি কমিটিতে শুধু উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যই থাকেন না; সিন্ডিকেট সদস্য, অনুষদের ডিন এবং (প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে) বিভাগীয় প্রধানও সদস্য হিসেবে থাকেন। নিয়োগ বা পদোন্নতি কমিটির সদস্যরা দলীয় বা ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে একজন শিক্ষকের মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতাকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী কমিটিতে কথা বললে শুধু উপাচার্য তাঁর পছন্দমতো লোক নিয়োগ দিতে পারেন না। নির্বাচনী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন অনুষদের ডিন। কিন্তু প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ডিনরা অনুষদভুক্ত শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন বিধায় তাঁরাও ব্যক্তিগত বা দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না। এ সমস্যা সমাধানে একটি উপায় হতে পারে বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তে বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের মতো অনুষদগুলোর ডিনের পদটিকেও এক-দুই বছর পরপর নির্দিষ্ট অনুষদের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে আবর্তন করার পদ্ধতি চালু করা।
ঘ. আজকাল অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে শিক্ষকসুলভ আচরণে ঘাটতি (সঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিতি, কোর্স সমাপন, পরীক্ষা নেওয়া, ফল ঘোষণা ইত্যাদি) লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, ওই সব দেখার দায়িত্ব বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও সংশ্নিষ্ট অনুষদের ডিনের। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অতিমাত্রায় দলবাজির কারণে তাঁরা কাউকে কিছু বলতে পারেন না। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে অতিমাত্রায় দলবাজি যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতেই হবে। এ জন্য রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ঙ. আন্তর্জাতিক ক্রমবিন্যাসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষকদের গবেষণার মান ও সম্পাদিত গবেষণার সংখ্যা দুই-ই স্বল্প। এর পেছনের কারণ মূলত দুটি- গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং কোনো একটি গবেষণা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাব। অবশ্য গবেষণার ফান্ড অতীতের তুলনায় বর্তমানে একটু বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মানসম্মত গবেষণা পরিচালনায় গবেষণা পদ্ধতির খুঁটিনাটি সম্পর্কে শিক্ষকদের জ্ঞান বৃদ্ধির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য প্র্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে 'গবেষণা পদ্ধতি' নামে কোর্স বাধ্যতামূলক চালু করতে হবে। এর পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিকসংখ্যক শিক্ষকের এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকে উৎসাহিত করতে হবে। সর্বোপরি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে শিক্ষকদের সম্পাদিত গবেষণার মান ও সংখ্যাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
উল্লিখিত সমস্যাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে ইউজিসি প্রস্তাবিত পাঁচটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে গুটিকয়েক প্রশিক্ষকের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হতে পারে। এতে দেশে উচ্চ শিক্ষার মান উন্নয়নে কোনো লাভ হবে না বলেই অনুমিত হয়।
ড. আজিজুর রহমান :অনারারি অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়