শনিবার বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচিতে যেসব শিক্ষার্থী বাধা দিয়েছিলেন, তাঁদের সবাইকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শিবিরকর্মী আখ্যা দেওয়াটা নিশ্চয় অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট। তবে বুয়েটের ওই প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের যে দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব আছে, তা জোর গলায় বলা যায়। আমার ধারণা, শিক্ষার্থীরা যদি জাতীয় শোক দিবস এবং তার মর্মন্তুদ ইতিহাস সম্পর্কে সত্যিই জানত; তা পালন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনকে ১৯৭৫ সালের পর একটা লম্বা সময় ধরে কী পরিমাণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সইতে হয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা রাখত- তাহলে ওই কাণ্ডটি তাঁরা ঘটাতেন না। তাঁদের বোঝা উচিত ছিল, যেদিনটিতে জাতির পিতাকে সপরিবার অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেদিনটি আর দশটা দিবসের মতো নয়; এ দিবসটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের গভীর আবেগ-অনুভূতি জড়িত। তাই বুয়েট ক্যাম্পাসের ওই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের বাধাকে আওয়ামী লীগের অনুসারীরা যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁদের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাতের সমতুল্য মনে করেন, তাহলে তাকে বাহুল্য বলা যায় না।
ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখে, সম্ভবত শিক্ষার্থীরাও বিষয়টা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। সে জন্যই শনিবার কর্মসূচির ব্যানারে ছাত্রলীগের নাম ছিল বলে যাঁরা স্লোগান দিয়েছিলেন 'ছাত্রলীগের ঠিকানা, এ বুয়েটে রাখব না'- তাঁরা সোমবার জাতীয় শোক দিবসের দিনে বুয়েট শহীদ মিনারে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়ার কর্মসূচিতে বাধা তো দেনইনি, বিরূপ কোনো মন্তব্যও করেননি।
বুয়েট শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণটা আমরা জানি। এ সংগঠনেরই স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে তাঁদের বন্ধু ও সহপাঠী আবরার ২০১৯ সালে নিহত হন শুধু জাতীয় স্বার্থবিষয়ক কিছু বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে। আবরারকে তখন যেভাবে পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে খুন করা হয়, তা ছিল খুবই হৃদয়বিদারক; স্বাভাবিকভাবেই তা শুধু বুয়েট শিক্ষার্থীদের নয়, গোটা জাতিকে ক্ষুব্ধ করেছিল। এ কারণেই বহু ক্ষেত্রে এ দেশে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদলেও আবরার হত্যার বিচার খুবই স্বল্প সময়ে শেষ হয় এবং সে বিচারে যেসব ছাত্রলীগ কর্মী প্রত্যক্ষভাবে ওই খুনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, একেবারে বিনাবাক্যে বিচারপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে বুয়েট কর্তৃপক্ষও অন্তত ২০ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে বহিস্কার করে। আশা করা যায়, আবরার হত্যা মামলার যে ডেথ রেফারেন্স এখন হাইকোর্টে আছে, তা-ও সম্ভাব্য স্বল্প সময়ে নিষ্পত্তি হবে এবং রায় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু আবরারের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে না; ক্যাম্পাসে প্রাণঘাতী সহিংসতায় যারা লিপ্ত হয়, তাদের উদ্দেশেও একটা কঠোর বার্তা যাবে।
এখানে বলে রাখা দরকার, দেশের শিক্ষাঙ্গনে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যকার সহিংসতায় স্বাধীনতার আগে কিংবা পরে আজ পর্যন্ত যত শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে, তাঁদের একজনের স্বজনও ন্যায়বিচার পাননি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে শাসক দলের অনুসারী বা ক্যাম্পাসে আধিপত্যকারী ছাত্র সংগঠনের হাতে যত নিরীহ ছাত্র প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদেরও স্বজনরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এদিক থেকে জানামতে, আবরার হত্যাকাণ্ড একমাত্র ব্যতিক্রম। এ ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটার পেছনে আছে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। এখন এই আন্দোলন যদি কোনো কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ে, তাহলে ন্যায়বিচারের জন্য সব মহলের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এ শঙ্কাটাই সৃষ্টি হয়েছে সেখানকার শিক্ষার্থীদের এক ধরনের শিশুসুলভ কিছু সিদ্ধান্তের কারণে। যেমন- তাঁরা আবরারের খুনিদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্রলীগকে শায়েস্তা করতে গিয়ে মাথাব্যথা সারাতে গোটা মাথাটাই কেটে ফেলার মতো করে বুয়েটে সব ধরনের ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা নিষিদ্ধ করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ দেশে বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী সংগঠন আছে, যারা এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি নিজেদের বিকাশের জন্য অনুকূল মনে করে। দীর্ঘ সময় প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর তৎপরতার কারণে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা এসব সংগঠন যদি বিদ্যমান পরিবেশে বুয়েটে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে তোলে এবং তা ধরে রাখার স্বার্থে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে শুধু আবরার হত্যার আন্দোলন লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না; ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট হবে- এটা নিশ্চিত।
আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রাম তো বটেই, স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামেও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা সবাই জানেন। সেখানকার শিক্ষার্থীদের এ পথে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সেখানকার ছাত্র সংসদ ইউকসুসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন কী দায়িত্ব পালন করেছে, তা-ও কারও অজানা নয়। এখন সেখানে ছাত্র রাজনীতির ওপর দেওয়া পাইকারি নিষেধাজ্ঞা যদি চলতে থাকে, তাহলে নিশ্চয় ওই ঐতিহ্যের ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশের প্রকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যা শিক্ষার সবচেয়ে পুরোনো ও খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দেশের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার মানও দারুণভাবে পড়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, এখানকার শিক্ষার্থীরাই কর্মজীবনে, বিশেষ করে দেশের নানা উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। উপযুক্ত সমাজ চেতনা ও সাংস্কৃতিক বোধ ছাড়া কোনো প্রকল্পই জনমুখী করা যায় না; আর এ বোধটা গড়ে ওঠে সাধারণত গণমুখী রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে।
আমার ধারণা, শুধু ছাত্রলীগকে বুয়েটে নিষিদ্ধ করা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়; তাই সবার কার্যক্রমকেই সেখানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম কী হতে পারে, তা এর আগে আমি বলেছি। আর ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ করেও কি ক্যাম্পাসে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা যাবে? কস্মিনকালেও নয়। আজকে নানা কারণে ছাত্রলীগের অধঃপতন ঘটলেও এটা মানতে হবে, দেশের সবচেয়ে পুরোনো এ সংগঠনটির ঐতিহ্য অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত হওয়ার কারণে এমন কোনো শিক্ষপ্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রলীগ সমর্থক নেই। আমি নিশ্চিত, বুয়েটের যে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাসের বাইরে রাখার জন্য এত প্রাণপাত করছেন, তাঁদেরও অনেকে সংগঠনটির সমর্থক; হয়তো পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তাঁরা স্রোতে গা ভাসিয়ে রেখেছেন। শিক্ষার্থীরা বড়জোর তাঁদের সহপাঠীদের প্রতি ছাত্রলীগকে বর্জনের আহ্বান জানাতে পারেন, আর যে কোনো মূল্যে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের ওপর সম্মিলিত চাপ অব্যাহত রাখতে পারেন। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র চর্চার জন্যও তা সহায়ক হতে পারে।
সাইফুর রহমান তপন :সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা