প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলাদেশের প্রথম নারী, যিনি ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। আক্রমণ করেছিলেন চট্টগ্রামের ইউরোপিয়ান ক্লাবে, যার সামনে লেখা ছিল- 'এখানে কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ'। গায়ের রং কালো ছিল বলে যাঁকে নিয়ে হরহামেশাই কথা বলতেন পরিচিতজন, সেই মেয়েটা ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেওয়াকেই উত্তম মনে করেছিলেন।
প্রীতিলতা জন্মেছিলেন ১৯১১ সালে, চট্টগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা জগদ্বন্ধু ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার কেরানি। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন প্রীতিলতা। তারপর ইডেন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। চলে যান গ্র্যাজুয়েশন করতে কলকাতার বেথুন কলেজে। গ্র্যাজুয়েশন শেষে চট্টগ্রামে ফিরে এসে নন্দনকাননে অর্পণাচরণ নামে একটি ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। এরই মধ্যে স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ আন্দোলিত করে প্রীতিলতার হৃদয়কে। ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রীতিলতা লীলা নাগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দীপালি সংঘের সদস্য হন। বেথুন কলেজে কল্যাণী দাসের নেতৃত্বে ছাত্রী সংঘের সদস্য হন। এক সময় মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে প্রথম নারী সদস্য হিসেবে নাম লেখান।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ রোববার ভারতবর্ষে ঘটে যায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদ বিদ্রোহ। মঙ্গল পান্ডে নামে এক সিপাহি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। বন্দুক হাতে ব্যারাকপুর প্যারেড ময়দানে বিদ্রোহের সূচনা করেন। মঙ্গল পান্ডে ইংরেজদের গোলামি থেকে ভারতবর্ষকে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলে ওঠেন- 'ওঠো, ভারতবাসী জাগো! হিসাবনিকাশের দিন এলো। একশ বছরের নির্যাতনে জর্জরিত মুমূর্ষু মা মুক্তির বেদনায় কাঁদছে।' মঙ্গল পান্ডের বন্দুক আর তরবারির আঘাতে একে একে ধরাশায়ী হন ইংরেজ অফিসার লেফটেন্যান্ট বর্গে, একজন সার্জেন্ট, একজন ইংরেজ দালাল সিপাহি। বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। বিদ্রোহ দমন করতে ইংরেজ হয়ে ওঠে আরও বেপরোয়া। শত শত সিপাহিকে নির্মমভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের হাত থেকে নিস্তার পাননি বিদ্রোহী সিপাহির স্ত্রী-সন্তানরাও।
সিপাহি বিদ্রোহের পর ইংরেজবিরোধী আন্দোলন দুটি শাখায় সংগঠিত হয়। একটি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস ধারার আন্দোলন; আরেকটি সশস্ত্র। অনুশীলন, যুগান্তরসহ নানা সংগঠন সৃষ্টি হয়, যারা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইংরেজকে বিতাড়িত করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। স্বদেশি আন্দোলন নামে এই আন্দোলনের শিখায় ঝাঁপ দিতে থাকেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হচ্ছেন সেই আন্দোলনের বীরকন্যা, যিনি সশস্ত্র উপায়ে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে নাম লেখানো প্রথম নারী সদস্য। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র হামলা করেন মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে থাকা বিপ্লবীরা। পুরুষ বেশে সেই হামলায় অংশ নেন প্রীতিলতা। গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন ইংরেজের হাতে বন্দি হওয়া নিশ্চিত, তখন নিজ হাতে সায়ানাইড খেয়ে নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করেন প্রীতিলতা। ইংরেজের হাতে বন্দি হয়ে নির্যাতনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় মনে হয়েছে তাঁর কাছে।
প্রীতিলতার চেতনার চর্চা যে খুব একটা হয়েছে, এমন নয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু ছাত্রী হলের নামকরণের মধ্য দিয়েই প্রীতিলতাকে স্মরণ করে বাংলাদেশ। ওই হলগুলোতে বাস করা ছাত্রীরাও প্রীতিলতার জীবন সম্পর্কে কিছু জানেন কিনা, সন্দেহ। এ বছর প্রীতিলতার আত্মাহুতির ৯০ বছর। তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক প্রদীপ ঘোষ সেলিনা হোসেনের 'ভালোবাসা প্রীতিলতা' উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন একটি চলচ্চিত্র। এপার বাংলা, ওপার বাংলার চেতনাসম্পন্ন বিশিষ্টজন এ চলচ্চিত্র নির্মাণে যেমন সহযোগিতা করেছেন, তেমনি আগ্রহভরে অপেক্ষায় আছেন চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য।
রুস্তম আলী খোকন: কলাম লেখক ও সংগঠক