ইসলামে নারীর অধিকার বিশেষভাবে স্বীকৃত। নর-নারীর সমন্বয়েই মানব জাতি। নারী মহান আল্লাহ পাকের এক বিশেষ নিয়ামত। ইসলাম পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদার অধিকারী করেছে; অত্যন্ত সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছে। কবির ভাষায়, 'বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।' অর্থাৎ সব কল্যাণকর বিষয়ে যতটুকু পুরুষের অবদান; ঠিক ততটুকুই নারীর।
নারীকে মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম। বিধান পালনে নারী-পুরুষের প্রতি সমান নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ সুরা বনি ইসরাইলের ৭০ আয়াতে ইরশাদ করেন- আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি।
এ আয়াত থেকে প্রমাণিত- মর্যাদার বিচারে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। নারী হয়ে জন্মানোর কারণে পুরুষের তুলনায় হীন ও নীচ মনে করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে নারীরাও মহান আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি। ইসলাম মা হিসেবে নারীকে সম্মানিত করেছে। মায়ের সম্মান ও খেদমত জান্নাত লাভের অন্যতম উপায়। রাসুলে পাক (সা.) বলেন, 'মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।' পবিত্র কোরআনে সুরা লোকমানসহ বিভিন্ন সুরায় মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ রয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ইমান-আমল ও ইবাদতে নারী-পুরুষের মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য নেই। তাকওয়া ও চরিত্রের মাপকাঠিতে যে যতটা খাঁটি প্রমাণিত হবে, আল্লাহর কাছে সে ততটাই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ সুরা আন-নাহলের ৯৭ আয়াতে ইরশাদ করেন- যে সৎকর্ম সম্পাদন করে, সে ইমানদার পুরুষ হোক কিংবা নারী হোক, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের দরুন প্রাপ্য পুরস্কার দেব; যা তারা করত।
পুরুষের কাছ থেকে কোমল ও সদয় ব্যবহার পাওয়া নারীর অধিকার। এ অধিকার স্বয়ং আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ১৯ আয়াতে ইরশাদ করেন- স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো। ইসলাম নারীর শিক্ষা অর্জনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করেছে।
নারীর সার্বিক নিরাপত্তার বিধান দিয়েছে ইসলাম। রাস্তা, কর্মস্থল, যত্রতত্র নারীদের হয়রানি করা তো দূরের কথা, বরং ইসলাম নারীদের সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি দিতেও কঠোর নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ সুরা নূরের ৩০ আয়াতে ইরশাদ করেন- হে রাসুল! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ তা অবহিত আছেন।
ইসলাম নারীকে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের চেষ্টা করা এবং নারীকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার ভয়াবহ শাস্তি ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ সুরা বনি ইসরাইলের ৩২ আয়াতে ইরশাদ করেন- 'আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্নীল কাজ এবং মন্দ পথ।' সুরা আন-নূরের ২৩ আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন- যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ইমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে ধিকৃত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।
নারীর মোহরানার অধিকার সম্পর্কেও ইসলাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। মহান আল্লাহ সুরা আন-নিসার ৪ আয়াতে ইরশাদ করেন- আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশিমনে। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।
নারীকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও ঘোষণা করেছে ইসলাম। পরকালের জবাবদিহি নারীর অধিকার, সম্মান, স্বাধীনতা ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিশেষ মাধ্যম। কারণ নারী-পুরুষ প্রত্যেককেই পরকালে তার কাজের ব্যাপারে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আর এ জবাবদিহিই মানুষকে নারী-পুরুষ নির্যাতনসহ যে কোনো অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি