রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন নতুন করে আবারও বলেছেন, তিনি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু 'স্মার্ট মানি' বলছে, তিনি সেটা করবেন না। কারণ ইতোমধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকে গেছে, সে খারাপ পরিস্থিতিকে আর ভালো করার উপায় নেই। মঙ্গলবার প্রকাশিত পুতিনের বক্তব্যের বহুলাংশ জুড়ে শুধু তাঁর পরিচিত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি। তিনি বর্তমান সংঘাতের জন্য আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউক্রেনকে দোষী করেছেন। দোনবাস অঞ্চলকে স্বাধীন করার তাঁর লক্ষ্যের কথা তিনি আবারও বলেছেন। তার পরও পুতিনের বক্তব্যে নতুন কিছু রয়েছে। যদিও তিনি আসলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে চান না। তিনি এমনকি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাঁর যে 'স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন' চালু করেছেন; সে যুদ্ধও অব্যাহত রাখতে চাইছেন বলে মনে হয় না। তার পরও তিনি যুদ্ধ করছেন। তার মানে, তিনি জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখন নতুন করে ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করা হবে। এই সংখ্যাটি নাকি রাশিয়ার মোট আড়াই কোটি রিজার্ভ সৈন্যের মাত্র ১ শতাংশ। পুতিন এই সপ্তাহে রাশিয়ার অধিকৃত দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের অঞ্চলগুলোতে গণভোট আয়োজনের কথা আবারও বলেছেন। একই সঙ্গে পশ্চিমাদের দায়ী করে বলেছেন, তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পারমাণবিক হুমকি দিচ্ছে। একই সঙ্গে পুতিন সতর্ক করে বলেছেন, যারা আমাদের পারমাণবিক দিক দিয়ে জিম্মি করছে, তাদের জানা উচিত, বাতাস ঘুরে যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, যুদ্ধ যে খারাপ দিকে যাচ্ছে- অবশেষে পুতিন তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। এর আগে সম্ভবত তাঁর অনুগতরা বিষয়টি গোপন করেছেন। পুতিন অংশবিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার মানে হচ্ছে, তিনি কট্টরপন্থিদের তুষ্ট করতে চাইছেন। তাঁর লক্ষ্য সম্ভবত রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ক্ষয়রোধ। সে জন্যই পুতিন পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি দিয়ে আসলে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য চেষ্টা করছেন।
এটি অন্যভাবেও কাজ করতে পারে। অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, কম অস্ত্রশস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা মানসিক দিক থেকেও শক্তিশালী নয় এমন সৈন্যবাহিনী দিয়ে সামরিক সমীকরণের পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। এমনকি ইউক্রেনের যে অংশকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও রাশিয়ার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। রাশিয়ার সমাজ থেকে যুদ্ধে মানবসম্পদের হিসাবের দাবি উঠলে কী করবেন পুতিন? কারণ যুদ্ধে পুতিন হারলে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষতি বহন করা কঠিন হবে।
যুদ্ধের এ খারাপ অবস্থা থেকে অর্থাৎ হার এড়াতে চাইলে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার একটি বিকল্প। ভদ্মাদিমির পুতিন তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, যুদ্ধ যদি তাঁর দেশের অখণ্ডতায় হুমকি হয়, তবে রাশিয়া তাদের কাছে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবে। এটাকে এভাবে বলা যায়, ইউক্রেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রিমিয়া হারানোর ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। কারণ ক্রিমিয়াকে ইতোমধ্যে রাশিয়া তার সার্বভৌম অঞ্চল হিসেবে দাবি করেছে এবং মস্কো দোনবাসকে তার অন্তর্ভুক্ত বলে যে ঘোষণা দিয়েছে, তা না মানলে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি থেকে যাবে। প্রশ্ন হলো, পুতিন কি তাঁর এই হুমকি কার্যকর করতে পারবেন? ওয়াশিংটন এবং পশ্চিমা অন্য রাজধানীগুলো দুটি বিষয় চিন্তা করছে।
আশাবাদীরা বিশ্বাস করেন, পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। কারণ এটি ব্যবহার করলেও তাঁর তেমন লাভ হবে না। পারমাণবিকের তথাকথিত যুদ্ধ বড় সৈন্য ও ট্যাঙ্কের বিপরীতে কাজ করে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সে অর্থে বিচ্ছিন্ন। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে যেসব অঞ্চল কিংবা শহরের দখল নেওয়া হবে সেগুলো ততটা আকর্ষণীয় নয়। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে তার প্রতিঘাত যেভাবে রাশিয়ার ওপর পড়বে, সে তুলনায় ওইসব শহর দখল করা আকর্ষণীয় নয়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন তার পরও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন, যাতে যুদ্ধের মোড় মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঘোরানো যায় এবং কিয়েভ ও ওয়াশিংটনকে শোকাহত করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সরাসরি ইউক্রেনে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে হবে। এর অন্যথা হলে একটি ভয়ংকর নজির সৃষ্টি হবে। নৈরাশ্যবাদীরা এটা নিশ্চিত নয় যে, পুতিন আসলে ব্লাফ দিচ্ছেন বা প্রতারণা করছেন। কারণ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও সেটা রাশিয়াকে উল্টো বিপদে ফেলবে, এমনটা নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অজানা কিছু অংশ এখনই যুদ্ধ বন্ধের জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে। এমনকি মস্কোর কাছে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও তারা যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ বন্ধ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে সাড়া দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের কাছে কিছু আকর্ষণীয় প্রস্তাবও রয়েছে।
রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সীমিত পর্যায়ে পারমাণবিক হামলা হলেও তার বিপরীতে ক্ষতি অনেক বেশি হবে। যুদ্ধে ন্যাটো সৈন্যবাহিনীর অংশগ্রহণ করা মানে রাশিয়াকে আরও অধিক সংখ্যায় পারমাণবিক হামলায় প্ররোচিত করা। সাইবার আক্রমণ কিংবা আরও অধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো সেনাবাহিনীর সরাসরি হামলার বাইরের প্রতিশোধ দুঃখজনভাবে রাশিয়ার অপরাধের তুলনায় অনেক দুর্বল হবে।
হ্যাঁ, পারমাণবিক বোমার ব্যবহার পুতিনের জন্য এক অস্তিত্বগত জুয়া হবে। কিন্তু তিনি যদি পরাজয়ের কথা চিন্তা করেন, যাতে তাঁর ক্ষমতা এবং সম্ভবত জীবনও হুমকিতে পড়বে, তবে তিনি কেন লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির মতো পরিণতি মেনে না নিয়ে এই জুয়া খেলবেন না? পুতিন যদি তাঁর ধারাবাহিক ভয়ংকর ভুল হিসাবের পরও সফল হন, তার পরও আমরা কীভাবে তাঁকে বিশ্বাস করব?
এটা অনুধাবন করা দুঃখজনক যে, এখন আমরা অর্ধশতকের মধ্যে মহাশক্তির পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গভীর সংকটে নিপতিত। এটা বলা আরও জরুরি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনকে পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করে আরও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া উচিত। যুদ্ধটি তিনি শুরু করেছেন। এখন তা শেষ করতে এর বিকল্পও নেই।
হল ব্র্যান্ডস: জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর; ব্লুমবার্গ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক