সদ্য সমাপ্ত মেয়েদের সাফ চাম্পিয়নশিপ ফুটবল ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা কাঠমান্ডুতে শিরোপা জিতেছে। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক দিন পর এটা খুব ভালো এবং তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ। আমার মতো আরও অনেকেরই প্রত্যাশা, এর ধারাবাহিকতা আগামীতেও বজায় থাকবে। মেয়েদের এই ফুটবল বিজয়ের আনন্দ জাতীয় পর্যায়ে যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা আর্থিক মানদণ্ডে বিচার করা না গেলেও এর রয়েছে অপরিসীম আবেগীয় তাৎপর্য। এ বিজয়ের খবরে অনেকে হয়তো আনন্দে হেসেছেন। অনেকে আনন্দে কেঁদেছেন। হয়তো অনেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁর নিজের মেয়েকে ফুটবল খেলতে মাঠে পাঠাবেন। আবার অনেকে যাঁরা নিজ মেয়ের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফুটবল খেলতে পাঠাননি; তাঁরা হয়তো আজ আফসোস করছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ শিরোপা জয় সমগ্র জাতিকে একত্র করেছে- এর চেয়ে বড় সুখবর আর কী বা হতে পারে এ মুহূর্তে!
সোমবার ফিনল্যান্ডে বসে ফিনিশ সময় বেলা ২টা ১৫ মিনিটে কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া মেয়েদের সাফ ফাইনাল বাংলাদেশ বনাম নেপাল খেলাটা দেখব বলে সপ্তাহ শেষে কিছু দাপ্তরিক কাজকর্ম সেরে রেখেছিলাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে ম্যাচটি দেখেছি। কী তেজোদীপ্ত খেলা ছিল আমাদের মেয়েদের! তাদের ফিটনেস, দৌড়ের ক্ষমতা, বল পজিশনিং, পাসিং, বল নিজেদের দখলে নেওয়া ও দখলে রাখা, ডিফেন্ডিং, আক্রমণ এবং সঠিক সময়ে গোল করার প্রচেষ্টা- সবই ছিল দেখার মতো এবং উপভোগ্য। ওরা ১১ জন লড়াই করে জিতেছে। জিতে প্রমাণ করেছে- লড়াকু মেয়েরা শিকড় থেকে শিখরে উঠতে জানে।
যে মেয়েরা কাঠমান্ডুতে খেলে নেপালকে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্য গর্বের শিরোপা নিয়ে এসেছে, তাদের কেউই কিন্তু কোনো ধনিক শ্রেণির পরিবারভুক্ত নয়। তারা সবাই উঠে এসেছে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণি থেকে; দুই বেলা পেট পুরে খাবারের জন্য যাদের সংগ্রাম করতে হয় নিত্যদিন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, টিকে থাকার দুর্ভাবনা তাদের পিছু ছাড়ে না।
দুর্ভাবনা এই জয়ের পরও রয়েছে। ইনজুরি ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় শত্রু। যে কোনো সময়, যে কোনো খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারে এই ইনজুরি। সবকিছু ঠিক থাকলে একজন ফুটবল খেলোয়াড় সর্বোচ্চ ৩৫ বা তার কিছু বেশি বয়স পর্যন্ত খেলতে পারে। এর পর তাদের অন্য কোনো কাজে যুক্ত হতে হয়। অনেকে বেকার হয়ে যায়। অনেক ফুটবল খেলোয়াড় জীবনের এক প্রান্তে এসে অর্থনৈতিক সংকটে ভোগে। তাই বলব, কাঠমান্ডুতে শিরোপাজয়ী মেয়েদের যথাযথভাবে পুরস্কৃত করা হোক। তাদের পেছনে বিনিয়োগ করা হোক। ফুটবলের পেছনে বিনিয়োগ করা হোক। ফুটবল কীভাবে দেশের ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা আমরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানির দিকে তাকালে খুব সহজে দেখতে পাই।
বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের পর দীর্ঘমেয়াদি আরও কিছু বিষয় ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের জাতীয় দলের এই সাফজয়ী মেয়েদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? সপ্তাহে কয়দিন বা কত ঘণ্টা তাদের অনুশীলন করতে হয়েছে? প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছে? তাদের কী ধরনের খাদ্য পরিকল্পনা ছিল? তাদের দক্ষতা বাড়াতে কীভাবে অনুপ্রাণিত করা হতো? এসব থেকে এখন অনেক কিছু শেখার আছে অন্যদের।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজের একটি অংশ এখনও বেশ রক্ষণশীল। এখানে মেয়েদের হাজার রকমের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। মেয়েদের পান থেকে চুন খসলেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয় গোটা পরিবারকে। বিশেষত মেয়েদের ফুটবল খেলায় নামার বিষয়টি সহজ নয়। মানুষে খারাপ বলবে বা বিয়ে হবে না- এই যুক্তিতে অনেক বাবা-মা তাঁদের মেয়েকে মাঠে খেলতে পাঠান না। অনেকে বলেন- খেলাধুলা ছেলেদের কাজ। ঘর-গৃহস্থালি কাজ মেয়েদের। বাংলাদেশের সাফজয়ী জাতীয় নারী দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের পিতা-মাতা ও স্বজনদের অভিবাদন জানানো উচিত। শত বাধা সত্ত্বেও যদি তাঁরা কন্যাকে মাঠে না পাঠাতেন, তাহলে হয়তো আমরা আনন্দের এই উপলক্ষ উপহার পেতাম না। জাতি গর্বিতও হতে পারত না।
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় আরেকটি বিষয় উদ্বেগজনক। খেলাধুলা বা শখ, বিশেষ করে আউটডোর বা বহিরাঙ্গনের খেলাধুলা জীবনের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ- তা যেন সবাই মিলে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এমনকি সমাজপতি, ধনিক শ্রেণি বা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও তাঁদের সন্তানদের এখন আর তেমন মাঠে খেলতে পাঠান না, বিশেষ করে ফুটবল খেলতে। মেয়েদের বা ছেলেদের বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের যেখানেই দেখুন না কেন; হাতেগোনা দুই-একজন ছাড়া ধনিক শ্রেণি বা শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা কোনো খেলোয়াড় পাওয়া যাবে না।
অথচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়; সুস্থ ও সুষ্ঠু জীবনের জন্যই খেলাধুলা অপরিহার্য। খেলাধুলা জীবনকে সুন্দর করে। অধিকন্তু, একজন মানুষ যখন খেলাধুলার প্রতি অনুরাগী হয় এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তখন সে সুস্থ ও সৃজনশীল থাকে। এর উল্লেখযোগ্য কারণ, খেলাধুলা প্রচুর পরিমাণে অতিপ্রয়োজনীয় এন্ডরফিন, ডোপামিন এবং সেরোটনিন হরমোন নিঃসরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে, যা মানুষকে সুস্থ ও সৃজনশীল রাখতে সাহায্য করে। তাই বলব, খেলাধুলায় সময় নষ্ট হয় না বরং সময়ের সদ্ব্যবহার হয়।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের মেয়েদের সাফল্যের পর আশা করি, আরও অনেক অভিভাবক অনুপ্রাণিত হবেন। নিজেও খেলবেন এবং সন্তানকেও মাঠে খেলতে পাঠাবেন। খেলাধুলা আয়োজনে সহযোগিতা করবেন।
ড. কাজী ছাইদুল হালিম: ফিনল্যান্ড প্রবাসী শিক্ষক ও গবেষক