তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া বাকি ৬১ জেলা পরিষদ নির্বাচন চলছে। জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। জেলা পরিষদে একজন চেয়ারম্যান, জেলার অন্তর্ভুক্ত উপজেলার সমসংখ্যক সাধারণ সদস্য এবং তাদের এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হবেন। ওই পরিষদে সদস্য থাকবেন সব উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, সিটি করপোরেশনের মেয়রের প্রতিনিধি। আবার পরিষদে ভোটাধিকারবিহীন সদস্য থাকবেন সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। উদাহরণস্বরূপ সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদে নির্বাচিত হবেন চেয়ারম্যানসহ ১৭ জন সদস্য, ১৬ জন উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পরিষদে পদাধিকারবলে সদস্য হবেন। আরও ১৬ জন আমলা সদস্যও পরিষদের সদস্য হবেন। তাঁরাই মূলত পরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।

সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'প্রশাসনিক একাংশ' অর্থ জেলা কিংবা এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যসাধনকল্পে আইনের দ্বারা অভিহিত অন্য কোনো এলাকা। অর্থাৎ জেলা সরাসরি সংবিধানস্বীকৃত, অন্যগুলো নিজ নিজ আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক একাংশ। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দেশের তিন স্তরের পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণা করলেও এগুলো আদৌ প্রশাসনিক একাংশ বা সংবিধানের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্থানীয় সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান নয়। কোনো স্তরেই সংবিধানের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। জেলা হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণের মূল স্তর, অথচ এটি উপেক্ষিত থেকেছে সব সময়। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে জেলা গভর্নর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও জেলা পরিষদসমূহকে সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

দ্বাদশ সংশোধনীর পর জেলা হোক বা অন্য কোনো স্থানীয় শাসন কর্তৃপক্ষ, তা হবে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যসাধনকল্পে। কী আছে এতে? সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদটি হুবহু তুলে ধরা হলো- '(১) আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে। (২) এই সংবিধান ও অন্য কোনো আইনসাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যে রূপ নির্দিষ্ট করিবেন, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় উল্লিখিত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক একাংশের মধ্যে সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন এবং অনুরূপ আইনে নিম্নলিখিত বিষয় সংক্রান্ত দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিবে :

(ক) প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য;
(খ) জনশৃঙ্খলা রক্ষা;
(গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।'

সংবিধানের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও মূল জেলা পরিষদ আইনটি ছিল মন্দের ভালো। এতে সব জেলায় একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সাধারণ সদস্য ও পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের সমন্বয়ে ২১ জনের পুরো পরিষদের নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। প্রারম্ভিক কাল ছাড়া প্রশাসক নিয়োগের বিধান ছিল না। ৩২ জন অনির্বাচিত সদস্য এবং ১৭ জন পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত মোট ৪৯ সদস্য (জেলাভেদে ভিন্ন সংখ্যক হলেও হার কাছাকাছি থাকবে) বিশিষ্ট জেলা পরিষদ গঠন বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায় নয়। সংবিধানের ৫৯(১) ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশের ভার অপর্ণ করা হবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের (পরিষদের) ওপর। আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান এবং অনির্বাচিত ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত পরিষদ এক নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনিক একাংশ ঘোষিত জেলা পরিষদ অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা শাসিত হওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত মাইলফলক মামলা কুদরত-ই ইলাহি পনির বনাম বাংলাদেশ-এর রায়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বলেন, 'স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্য হলো স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা স্থানীয় বিষয়াবলির ব্যবস্থাপনা করা। যদি সরকার কিংবা তাদের আজ্ঞাবহদের এসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য আনা হয়, তাহলে এগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না।' প্রশাসক নিয়োগের বিধান, আমলা ও অন্য পরিষদের প্রধানদের জেলা পরিষদের সদস্য করায় এটি স্থানীয় সরকারের বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, 'জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।'

উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার প্রধান নির্বাহীকে জেলা পরিষদে সদস্য করার বিধান বাতিল করে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জেলা পরিষদকে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য, জনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনসাধারণের কার্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা জেলা পরিষদসমূহকে প্রদান করতে হবে। জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিধান করতে হবে। বলা হয়, বিশাল আয়তনের জেলায় সরাসরি চেয়ারম্যান নির্বাচন করা অসম্ভব। এটি যুক্তিসংগত, তবে সারা জেলায় সরাসরি জনগণের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী তো সারাদেশের জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত নন। সারাদেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন। একইভাবে সারা জেলার সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত জেলা পরিষদ সদস্যরা তাঁদের মধ্য থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রভৃতি নির্বাচিত করতে পারেন। গোঁজামিলের জেলা পরিষদ বাতিল করে সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা পরিষদ গঠন করতে হবে। জেলায় জেলায় জনসংখ্যার তারতম্য, ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জীবনযাত্রা, নাগরিক সমস্যা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ভিন্নতা প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় রেখে পার্বত্য জেলাগুলোর মতো এবং জনসংখ্যা অনুযায়ী সদস্যসংখ্যার তারতম্য করে প্রতি জেলার জন্য আলাদা আলাদা জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সালেহিন চৌধুরী শুভ: নির্বাহী পরিচালক, হাউস