রাজধানীতে আবারও হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের গুলিস্তান প্রান্তে ১১ সেপ্টেম্বর হকার উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এ অভিযান শুরু হয়। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তাঁর আওতাধীন সড়কগুলোকে তাঁদের ব্যস্ততা অনুসারে লাল, হলুদ ও সবুজ রঙে চিহ্নিত করেছেন। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, লাল রঙের সড়কগুলোর আশপাশে কোনো হকার বসতে পারবেন না; হলুদ রঙের সড়ক হকারদের জন্য আংশিক উন্মুক্ত থাকবে আর সবুজ রঙের সড়কের পাশে হকাররা প্রয়োজন অনুযায়ী বসতে পারবেন। ১১ সেপ্টেম্বরের অভিযান ছিল মেয়রের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ। অত্যন্ত ব্যস্ত সড়ক হওয়ায় গুলিস্তান এলাকাটি পড়েছে লাল অঞ্চল বা রেড জোনে। তবে পরিহাসের বিষয় হলো, আগের উচ্ছেদ অভিযানের মতো গুলিস্তান এলাকায় এবারের হকার উচ্ছেদ অভিযানটিও হকারদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। বর্তমান মেয়রের পূর্বসূরি সাঈদ খোকন ২০১৬ সালে একই এলাকায় একই ধরনের অভিযান চালিয়েছিলেন। কিন্তু হকারদের প্রতিরোধের মুখে তা সফল হয়নি। শুধু তাই নয়, সাঈদ খোকনের পিতা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মো. হানিফও একই উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সন্দেহ নেই, গুলিস্তানসহ নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে প্রতিদিন যে ভয়াবহ যানজট লাগে, এর অন্যতম প্রধান কারণ সড়কগুলোতে হকারদের দখলদারিত্ব। অতএব, সড়কগুলো হকারমুক্ত রাখা যে কোনো মেয়রের গুরুদায়িত্ব। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ কর্তব্য পালন করতে গিয়ে মেয়র হানিফের উত্তরসূরিরা ১৯৯০-এর দশকের শেষ পাদে তাঁর ওই ব্যর্থ হকার উচ্ছেদ অভিযান থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি; তাই তাঁরাও হকার উচ্ছেদের নামে বারবার ব্যর্থ অভিযান চালাচ্ছেন।

মেয়র হানিফের ওই উচ্ছেদ অভিযানের সময়েই শুধু হকার সংগঠনগুলো নয়, প্রায় সব মহল থেকেই উচ্ছেদের আগে হকারদের যথাযথ পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানানো বা পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। মেয়র হানিফ তা মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ওসমানী উদ্যান ও মুক্তাঙ্গনে প্রতিজনকে ৪ বর্গফুট করে ৪ হাজার হকারকে পুনর্বাসিত করার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা তাঁর আমলে তো নয়ই, পরবর্তী সময়েও বাস্তবায়িত হয়নি। তা ছাড়া সেই সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের আমল থেকে আজ পর্যন্ত রাজধানীতে হকারদের পুনর্বাসনের কথা বলে শতাধিক মার্কেট নির্মিত হয়েছে; সেই মার্কেটগুলোর প্রায় সব দোকান এখন কোনোকালে হকার ছিলেন না এমন লোকদের দখলে। যেমন- শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে সিটি করপোরেশন নির্মিত সব মার্কেটে ক্ষতিগ্রস্ত বা হকারদের বদলে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন 'রাজনৈতিক নেতা, হকার নেতা, কাউন্সিলর, সিটি করপোরেশন ও আমলাদের আত্মীয়স্বজন'। অভিযোগ আছে, দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন জামানতসহ যেসব শর্ত আরোপ করে, তা পূরণ করা হকারদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকা শহরে যাঁরা হকারি করেন, তাঁরা প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে নদীভাঙনসহ বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সব হারিয়ে বেঁচে থাকার উপায় সন্ধানে গ্রামের ভিটেমাটি ছেড়ে আসা মানুষ। শিক্ষাদীক্ষাও তেমন থাকে না তাঁদের। খুবই স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করে থাকেন তাঁরা। তা ছাড়া অনেকটা দিনে এনে দিনে খাওয়া এ মানুষদের পণ্য বিক্রির জন্য সহজে জনসমাগম হয় এমন স্থানে বসা ছাড়া উপায় থাকে না। তাই তাঁরা পুলিশি হাঙ্গামা, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যসহ শত বিপাক সত্ত্বেও ব্যস্ত সড়কের পাশে বসতে বদ্ধপরিকর থাকেন। আবার কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীও যে হকারদের সামনে দিয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেয়, তাও সত্য।

আমাদের বক্তব্য হলো, এ সামগ্রিক বাস্তবতা বুঝে লোক-দেখানো বা মেকি পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাদ দিয়ে হকারদের যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে অন্তত ব্যস্ত সড়কগুলো হকারমুক্ত রাখা যাবে। এ লক্ষ্যে প্রথমেই সিটি করপোরেশনকে প্রকৃত হকারদের তালিকা করতে হবে; সে তালিকা ধরে সহজ শর্তে দোকান বরাদ্দ দিয়ে হোক, অভিবাসী কর্মী হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুকদের বিদেশে পাঠিয়ে হোক কিংবা সড়কের পাশে যান চলাচলে বিঘ্ন তৈরি না করে নির্দিষ্ট জায়গায় বসার সুযোগ দিয়ে হোক- হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় পুনর্মূষিকোভব!

বিষয় : পুনর্মূষিকোভব সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন