ফুটবলার হিসেবে তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠক হিসেবে শুনতে হয়েছে বেশি সমালোচনা। মেয়েরা সাফের শিরোপা জেতায় চতুর্থ মেয়াদ হিসেবে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের আক্ষেপ ঘুচেছে। ইতিহাস গড়ার উচ্ছ্বাস তাঁকে ছুঁয়ে যায়নি। এটা দলগত পরিশ্রমের ফসল বলেই মনে করছেন তিনি। মেয়েদের ফুটবলের সাফল্যসহ আরও নানা বিষয় নিয়ে শনিবার সমকালের সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছেন।

সমকাল: মেয়েদের ফুটবলের সাফল্যগাথা আপনার সময়েই।

সালাউদ্দিন: এটার পেছনে এমন অনেক কষ্ট ছিল, যা অনেকের কাছেই অজানা। সবচেয়ে বড় কঠিন ছিল আমার ফাইন্যান্সিয়াল সমস্যা। মেয়েদের সাফল্যে ওই কষ্টটা এখন আমার অন্তর থেকে মুছে গেছে। ছাদ খোলা বাসে মেয়েরা ট্রফি নিয়ে দাঁড়িয়ে, আর রাস্তার দুই পাশে জনতার ঢেউ- মুহূর্তটি দেখে আমার খুবই ভালো লাগছিল। সত্যি বলতে কি, কিছু কিছু ভালো লাগা আছে, যার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মেয়েদের সাফ জয়ের অনুভূতিও তাই।

সমকাল: মেয়েদের ফুটবল শুরু নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন...

সালাউদ্দিন: লোক দেখানো নয়, সত্যিকারভাবে মেয়েদের ফুটবল আমরা শুরু করি ২০১৫-তে। সে সময় দেশব্যাপী একটা সার্ভে করে আমরা ৫০ জনকে নিয়ে আসি। তখন আমাদের কোনো বাজেটও নেই কিংবা কোনো ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান আমাদের সাপোর্টও দেয়নি। তিন-চার বছর আমরা নিজেরাই ব্যক্তিগত ফান্ড দিয়ে এই মহিলা ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখি। এরপর ঢাকা ব্যাংক আসে। অল্প কিছু টাকা ফিফা থেকে আসে। এরপর আমার প্রধান টার্গেট ছিল, টেকনিক্যাল স্টাফ খুব শক্তিশালী হতে হবে। তখন আমরা টেকনিক্যাল স্ট্র্যাটেজিক হিসেবে পল স্মলিকে নেই। তাঁর সঙ্গে ছোটন আর লিটনকে নেই।

সমকাল: যখন এই মেয়েদের এনেছিলেন, তখন মনে কোনো শঙ্কা কাজ করেছিল কিনা?

সালাউদ্দিন: শুরু থেকে নানা শঙ্কা ও ভয় কাজ করেছিল আমাদের মধ্যে। ভয় ছিল বলেই তো আমাদের বাফুফেতে আবাসিক ক্যাম্প করেছি; চোখে রাখার জন্য। টেকনিক্যাল স্টাফদের দিয়ে রাখলাম। ভয় তো সব সময় থাকে। তবে আমি খুবই গর্বিত, তাদের এখানে রেখেছি যে লক্ষ্য সামনে রেখে, সেটা পূরণ হয়েছে।

সমকাল: মেয়েদের উৎসবে যোগ হয়েছে ছেলেদের জয়। ফুটবলে সুবাতাস বইছে।

সালাউদ্দিন: একজন ফুটবলার হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ট্রেনিং, ট্রেনিং আর ট্রেনিং। আপনি দেখেন, মেয়েরা ট্রফি জেতার দু'দিন পর ছেলেরা জিতেছে। এখন সবাই কিন্তু সাধুবাদ জানাচ্ছে আমাদের। ফুটবলে সুবাতাস তো মাত্র বইতে শুরু করেছে। আমাকে আরও সময় দেন; দেখবেন এই ফুটবলটা কোথায় নিয়ে যাই।

সমকাল: আপনার মেয়াদে ফুটবলের ভরাডুবি হয়েছে- এ কথাও কিন্তু বলছেন অনেকে।

সালাউদ্দিন: এই কথাগুলো তাঁরাই বলেছেন, যাঁরা খেলা দেখেন না, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, যাঁরা এই কথাগুলো বলে আপনাদের শিরোনাম পায়। টেলিভিশনে টক শোতে তারা ফুটবল ফেডারেশন ও আমার চৌদ্দ গুষ্টি উঠিয়ে ফেলেন। কিন্তু আমি কোনো পেশাদার লোককে দেখিনি এসব কথা বলতে। এ কথাগুলো বলেছে অপেশাদার লোক এবং তাদের কাছে এগুলো একটা মজার বিষয় হয়ে গিয়েছিল। সেই সমালোচকদের সমুচিত জবাব এখানকার খেলার রেজাল্ট। কারণ আমি কথাতে নয়, পারফরম্যান্সে বিশ্বাসী।

সমকাল: ট্রফি জয়ের পর মেয়েদের বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আরও বেশি উঠেছে...

সালাউদ্দিন: যেহেতু প্রশ্নটা করেছেন, তাহলে আমি ক্লিয়ার করে পুরোটা বলছি। অনেকে টক শো করে, নিউজ মিডিয়ায় বলছে, মেয়েরা ১০ হাজার টাকা পায়, ছেলেরা এত পায়- এই সেই। সবাই এটা ভুল করছে। ভুলটা কোথায় সেটা হলো, মেয়েরা ১০ হাজার টাকা যেটা পায়, এটা পকেট অ্যালাউন্স। যখন এরাই লিগে খেলতে যায়, তখন তারা ৭, ৮, ১০ লাখ টাকা করে পায়। এই পয়সা কিন্তু বাফুফের হওয়ার কথা। কিন্তু ফুটবল ফেডারেশন না নিয়ে তাদের দিয়ে দেয়। আমার একাডেমির ছেলেদের ক্ষেত্রে কিন্তু ভিন্ন। সেদিন মোহামেডানের কাছে এক ফুটবলারকে বিক্রি করেছি ১০ লাখ টাকায়। তার পুরোটা কিন্তু বাফুফে নিয়েছে। স্থায়ীভাবে ১০ হাজার দিলেও সেটা হাতখরচ। আর ছেলেদের তো আমরা এক পয়সাও দিই না। এটা সম্পূর্ণ ক্লাব থেকে দিই। এই কথাগুলো যখন না বুঝে এবং না জেনে বলে, তখনই দুঃখ লাগে। বরং তারা বলুক, আমি স্পন্সর এনে দিলাম; কিন্তু সেটা তো তারা করে না। হঠাৎ ঘটনাটা হয়ে গিয়েছে কি, মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি।

সমকাল: ফুটবলার সালাউদ্দিন আর সংগঠক সালাউদ্দিনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটা?

সালাউদ্দিন: আমার জীবনে মেয়েদের সাফ ট্রফি জয়টি অন্যতম অর্জন। আমার সব অর্জনের মধ্যে এটা অন্যতম।

সমকাল: বাফুফেতে দেখা গেল, কোচ-অধিনায়কের বসার জায়গায় এমন কিছু লোক বসেছিলেন, যাঁদের মেয়েদের ফুটবলে কোনো অবদান নেই।

সালাউদ্দিন: আমি একবারও চিন্তা করিনি। আমার জীবনে আপনারা আমাকে খুব সাপোর্ট দিয়েছেন। এখন মেয়েরা সাফল্য এনে দিয়েছে, তারাই সব আলো পাক। সোশ্যাল মিডিয়া আমি দেখেছি, এটা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। বাফুফের বিরুদ্ধে কিছু হলে খারাপ তো লাগেই। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি এটা নিয়ে আর আলাপ করছি না।

সমকাল: বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে সালাউদ্দিন কী ভাবছেন?

সালাউদ্দিন: আমি তো এখন আর ঘুমাতে পারছি না। আমার কর্তব্য আরও বেড়ে গেছে। আরও সুন্দর করে সাজাতে চাই। এ জন্য আমি লিগ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়েছি।