পর্যটন খাত একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে, তা আমরা শ্রীলঙ্কায় দেখেছি। করোনার ছোবলে দুই বছর পর্যটক না আসায় একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রের কী করুণ অবস্থা হয়েছে, তা সবারই জানা। শ্রীলঙ্কার এই দুরবস্থার জন্য আরও অনেক নিয়ামক থাকলেও দুই বছর পর্যটন শিল্প বন্ধ থাকাকেই প্রধানত দায়ী করছেন বিশ্নেষকরা। তবে তাঁরা এটাও বলছেন, কোনো দেশের অর্থনীতি একক খাতের ওপর নির্ভরশীল হলে ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি ও রেমিট্যান্স। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে পর্যটন খাত।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখনও আশানুরূপ বিকশিত হয়নি। সমুদ্রসৈকত ও পার্বত্যাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে শিল্পটি। এসব স্থানে ঘুরতে যাওয়া বেশিরভাগই দেশীয় পর্যটক। বিদেশি পর্যটক বাড়ানো না গেলে তা অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে না। এ জন্য পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ড রয়েছে। তাদের দায়িত্ব দুর্বলতা কাটিয়ে দেশকে বিদেশের কাছে তুলে ধরা। করোনা ছাড়াও শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতে ধস নামার আরও একটি কারণ হচ্ছে, সে দেশের গির্জায় বোমা হামলা। এটি বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কিত করেছিল। আমাদের দেশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইতিবাচক প্রচারণা চালাতে হবে।
শুধু শ্রীলঙ্কা নয়; আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান ও ভারতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অগণিত পর্যটক যান। আমাদের দেশের অনেক ভ্রমণপিপাসু পর্যটকও এসব দেশে যাচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। আন্তর্জাতিকভাবে ব্র্যান্ডিং না হওয়ায় আমাদের পর্যটন শিল্প বলতে বিদেশিরা বোঝেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আর রাঙামাটি-বান্দরবান-সুন্দরবন-সেন্টমার্টিন। সাগরকন্যাখ্যাত কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে তেমন বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা দেখা যায় না। অথচ এ সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। পদ্মা ও লেবুখালী সেতু উদ্বোধন হওয়ায় কুয়াকাটা ভ্রমণ সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল নির্মিত না হলে এবং বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া না গেলে বেশি দিন পর্যটক ধরে রাখা যাবে না। আর সবার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের মতো সমুদ্রসৈকত, পাহাড় ও ঝরনা বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে। সুতরাং বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে হলে ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। এ তিন নদী ছাড়াও দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের নদীগুলোকে নিয়ে ভাবা যায়। মনপুরা, হাতিয়া ও ভাসানচরে এ দেশের অনেক পর্যটক যাচ্ছেন। কিন্তু ক'জন বিদেশি পর্যটক এসব স্থানের নাম জানেন! প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে এসে অনুপম কিছু করা গেলে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়বে।
বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে আজকের দিনটি বিশ্ব পর্যটন দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে সেতুবন্ধ গড়ে তোলা। এ ছাড়া পর্যটনের ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্র্রসারণের ফলে বিশ্বব্যাপী পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটে। এ অবস্থায় পর্যটনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও ভোক্তাশ্রেণির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক ভ্রমণবিষয়ক সংস্থা আইইউওটিও। এ সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রসারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব আয়ে বিশেষ অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটির কার্যক্রম আরও জোরদার করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনের সময় এ সংস্থার সদস্যভুক্ত দেশগুলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করার মাধ্যমে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছিল। ১৯৮০ সালের বার্ষিক সম্মেলনে এ সংস্থা গঠনের দিনে অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পর্যটন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। 'পর্যটনে নতুন ভাবনা' প্রতিপাদ্যে আজ বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি।
মিজান শাজাহান: সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com