সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা। একটি পত্রিকার জন্য জনপ্রিয়তা বজায় রেখে এতগুলো বছর পাড়ি দেওয়া কম কৃতিত্বের দাবি রাখে না। এ জন্য পত্রিকাটিকে সদাসর্বদা সতর্ক থাকতে হয় যেন তার কোনো নৈতিক স্খলন না ঘটে, শুনতে না হয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। যেসব সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম একপেশে, বিশেষভাবে প্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন করে তাদের প্রতি পাঠকের মনোভাব অজানা নয়। এক বিদেশি সংবাদকর্মীর কথায় 'দৈনিক পত্রিকাগুলোকে প্রতিদিন জনতার সামনে নির্বাচনী পরীক্ষায় দাঁড়াতে হয়। পত্রিকাটির সংবাদ পরিবেশনা সত্যনিষ্ঠ বা বিশ্বাসযোগ্য না হলে পাঠক নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সেই পত্রিকা কিনবেন না।' এই কথাটা যেমন সত্য, তেমনই বাস্তবতা হচ্ছে অন্যান্য আরও কিছু কারণেও একটি পত্রিকার পাঠক সংখ্যা বড় হতে পারে। শুধু পাঠকসংখ্যা বা জনপ্রিয়তা দিয়েই একটি সংবাদপত্রের মান সম্পর্কে মতামত দেওয়া যায় তা বলতে চাই না। তবে সমাজ সচেতন পাঠক অবশ্যই একটি সৎ, নিরপেক্ষ, স্পষ্টভাষী, জনস্বার্থবান্ধব প্রকাশনাকে আলাদা মর্যাদা দিয়ে থাকেন। সেই স্তরের সংবাদপত্রের মধ্যে সমকাল যে তার জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে, সে কথা অনস্বীকার্য।

কথায় কথায় সমাজ সচেতনতার প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসে গেল। সচেতনতার বিপরীত শব্দ হচ্ছে অসচেতনতা অথবা অচেতনা। অর্থাৎ অসাড়তা। গতিশীলতার অনুপস্থিতি। অসচেতন সমাজ একটি স্থবির সমাজ যেখানে বোধ-বুদ্ধি-বিবেক থাকে বন্দিত্বের নিগঢ়ে বাধা। স্পষ্টতই সেখানে রাজ করে অগণতান্ত্রিক আধিপত্যবাদ, বৈষম্য, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা। দুর্নীতি হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের জীবন ধারণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যেনতেন প্রকারে সবাইকে পেছনে ফেলে নিজের স্বার্থ রক্ষা আর বিত্তবৈভব কামানোই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র লক্ষ্য ও উপায়। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, শিক্ষার সংকট, রাজনৈতিক অসহিষুষ্ণতায় দেশের নাগরিকরা পরিণত হয় অধিকার ও দায়িত্ববোধহীন জনগোষ্ঠীতে; যাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয় প্রতিপদে নির্বিবাদে। তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সেটাই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা গ্রাস করে ফেলে ছোট থেকে বড় সবাইকে।

তারা দেশ ও রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা দেখতে পায় না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সক্রিয় ও সম অংশগ্রহণের শর্তটি থেকে যায় উপেক্ষিত, বাধাগ্রস্ত। যে কোনো আলোচনা-সমালোচনাকে ক্ষমতাসীন ও তাদের সুবিধাভোগীদের পক্ষ থেকে বৈরিতার লেবেল এঁটে দেওয়া হয়। ফলে যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন আর যাঁরা তাদের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেন, তাঁদের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব নাগরিকদের অংশীদারিত্বের বোধকে করে পর্যুদস্ত। সচেতন নাগরিক সমাজ এর পরিসর সংকুচিত হয়ে আসতে থাকে। সমাজ হয়ে ওঠে অত্যাচার আর অনাচারে প্রতিবাদ ও প্রতিকারহীন। বরং সমাজই যেন হয়ে ওঠে নিগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র। আইনের শাসনের দুর্বলতায় যে কেউ সুযোগমতো আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো বেআইনি কাজ করতে দ্বিধা করে না। সমাজের নামে চলে নারী নিগ্রহ, গণপিটুনি, সাম্প্রদায়িক হামলা। সমাজ পরিবর্তন বা প্রগতির জন্য প্রস্তুত নয় অজুহাতে রক্ষণশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল আইন-কানুন বজায় রাখা। উপরন্তু সেই বদ্ধ সমাজ রক্ষার জন্য নতুন নতুন নিবর্তনমূলক নীতি আর আইনের প্রবর্তন ঘটতে থাকে।

'জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস' আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেও ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতায় যেতে উৎসুক রাজনৈতিক দল গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে আপসকামিতার নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে। তখন সে সমাজে নারী-পুরুষ- শিশু বা যে কোনো পরিচয়ের মানুষ বৈষম্য ও অনিরাপত্তাবোধের চক্রে আবর্তিত হতে বাধ্য হয়। পেশাজীবীরা শঙ্কাহীন চিত্তে তাঁদের দায়-দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। সবচেয়ে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় গণমাধ্যমকে, যে ক্ষেত্রটিকে বলা হয়ে থাকে একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। মুক্ত ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা শান দেওয়ার দায় বহন করে থাকে। কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হলে সমাজ কাঠামো এতটাই ভঙ্গুরতার ঝুঁকির মুখোমুখি হয়, মুক্তচিন্তার চর্চা সেখানে প্রবেশাধিকার পায় না। গণমাধ্যমসহ যে কেউ স্থিতাবস্থার পরিবর্তনের কথা বলে স্বার্থসংশ্নিষ্টদের অসন্তোষের মাশুল গুনতে হয় তাদের।

যুগ যুগ ধরে একটি স্বৈরতান্ত্রিক সমাজের এ রূপই প্রতিভাত হয়ে আসছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সমাজ সচেতন মুক্তিকামী মানুষ ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করেছে, পরিবর্তন এনেছে। উৎসারণ ঘটিয়েছে মানবসভ্যতার। পথ উন্মুক্ত করেছে মুক্তবুদ্ধির প্রবেশের। সমাজ অভিষিক্ত হয়েছে মানবসমাজ বলে, মানবিক মর্যাদার সমাজ বলে। তাই তো এক একটি যুগকে আমরা চিহ্নিত করেছি স্বর্ণযুগ বলে। আমাদের জন্য আমরা পেয়েছি একুশে, পেয়েছি একাত্তর। স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে সূচনা করেছি গণতন্ত্রের অভিযাত্রার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এসব অর্জন ও উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখতে বা সমৃদ্ধ করতে আমরা কতখানি যোগ্যতার পরিচয় রাখতে পেরেছি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আমরা অঙ্গীকার করেছি, বাংলাদেশ হবে এমন একটি দেশ যেখানে নিশ্চিত করা হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে নাগরিকদের জন্য সুশাসন ও সকল মৌলিক অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকারের মান নির্ণয় করার পরিমাপক হিসেবে জাতিসংঘের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে সমাজে মানবাধিকার সম্মানিত সেখানে বিরাজ করবে স্বাধীনতা, শান্তি এবং ন্যায়বিচার। সকল সদস্য রাষ্ট্রের মতো, আমাদের জন্যও তা প্রযোজ্য।

একই কথা বলা যায় দুর্নীতি ও নির্যাতনবিরোধী ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের কনভেনশন, শিশু অধিকার কনভেনশনসহ অন্যান্য চুক্তিসমূহ সম্পর্কে। এ সবকিছুর আলোকে আমাদের আজকের অবস্থান বিশ্নেষণ করার তাগিদ অগ্রাহ্য করা যায় না। উন্নয়নের মৌলিক শর্তও তাই। মানব উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ মাহবুব উল হকের কথায় (১৯৭৭) অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাহাত্ম্য বিচার করতে হলে দেখতে হবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব কতটা গভীর। যে উন্নয়ন মানুষের সামনে স্বাধীন ও নিরাপদভাবে নিজের মতো করে একটি শোভন জীবনযাপনের সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো উন্মুক্ত করে দিতে পারে না, সেই উন্নয়নের অন্য যে কোনো বৈশিষ্ট্যই থাকুক না কেন সার্বিক বিচারে তা অর্থবহতার দিক থেকে পেছনে পড়ে যায়।

এ পরিস্থিতি থেকে নিজের জীবন ও সামাজিক প্রবাহকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সুশিক্ষা, মানবিক সংবেদনশীলতা, মুক্তবুদ্ধির সঞ্চারণের কোনো বিকল্প নেই। একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যেখানে সব মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব উৎসাহিত করা হয়, সেখানেই তেমন সমাজ নির্মাণ সম্ভব। তা করতে হবে সবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সবার সার্বিক মঙ্গলে বিশ্বাসী শক্তির নেতৃত্বে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে যুক্ত না করে, তাদেরকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান না করে শুধুই ক্ষমতার হস্তান্তর স্থায়ী কোন সমাধান এনে দিবে না। ... ক্ষমতার বদলে যদি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকে, তবে তা বৃহৎ মঙ্গলের পক্ষে কাজ করতে পারে না।' কে না জানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিও ছিল মানুষকে, মানুষের মঙ্গলকে কেন্দ্র করে, যার চালিকা শক্তি ছিল মানুষের মুক্তির ইচ্ছায় নিহিত। চিন্তার মুক্তি না ঘটাতে পারলে একটা সমাজ কখনও সেই মানুষের সমাজে উত্তরিত হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে একটি সৎ, মুক্ত গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।
সমকাল সেই কাজটি সার্থকতার সঙ্গে করে যাবে- এই প্রত্যাশা করছি।

লেখক
মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব