আজ মওলানা জালালুদ্দিন রুমির ৮১৬তম জন্মদিন। জালালুদ্দিন রুমি হলেন মহান মানবতাবাদী ও জগৎশ্রেষ্ঠ একজন আধ্যাত্মিক কবি ও দার্শনিক। তাঁকে বলা হয় 'দ্য মেসেঞ্জার অব লাভ অ্যান্ড উইজডম'। অর্থাৎ প্রেম ও প্রজ্ঞার বার্তাবাহক। রুমি বলেছেন, 'ইন সোখানে অবিস্ত আয দারয়ায়ে বিপায়ানে এশ্‌ক, তা জাহানরা অব বাখশাদ জেসমহারা জান কোনাদ।' অর্থাৎ সীমাহীন প্রেমদরিয়ার পানির কথা এটি, ধরণীকে পানি আর দেহে দেবে প্রাণ যেটি। কিন্তু আমাদের আজকের সমাজে সেই প্রেমেরই বড় অভাব। এ কারণেই আমাদের মাঝে আজ অশান্তি বিরাজিত। মূলত সমাজদেহ থেকে শান্তি তিরোহিত। বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, বিশ্বজুড়ে ধারাবাহিকভাবে নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেই চলেছে। মানুষের মাঝে অস্থিরতা, অস্বস্তি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সমাজদেহে শান্তি-স্বস্তির বড় অভাব এবং ক্রমান্বয়ে তা আরও অধিকতর অশান্তির পানেই ধাবিত হচ্ছে। আমরা এ অবস্থার দ্রুত অবসান চাই। সে জন্য প্রয়োজন মানুষের প্রতি মানুষের দরদ ও দায়বদ্ধতা। সেটি তখনই আসে যখন মানুষের মধ্যে অন্যের প্রতি মমত্ববোধ ও ভালোবাসা থাকে, প্রেম থাকে।
অধ্যাত্মবাদের প্রাণপুরুষ রুমি তাঁর কাব্য-সাহিত্য রচনা এবং প্রেমদর্শন প্রচারে ফারসির পাশাপাশি আরবি, তুর্কি আর গ্রিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। জন্মেছেন আফগানিস্তানের বালখে। কীর্তিময়তার স্বাক্ষর রেখেছেন গোটা পারস্যে, আর তীর্থস্থানে পরিণত হওয়া তাঁর মাজার রয়েছে তুরস্কের কৌনিয়ায়। তিনটি দেশেই তিনি সমভাবে, সমমর্যাদায় সমাদৃত। এ সৌভাগ্য পৃথিবীতে শুধু তাঁর। এর বাইরে সারাবিশ্বে তিনি পরিচিত ও নন্দিত। অধ্যাত্মবাদের বিশ্বকোষ 'মসনভি শরিফ'-এ তিনি গেয়েছেন ২৬ হাজার দ্বিপদী বেইত। ফারসি ভাষার কোরআনখ্যাত এই 'মসনভি' হচ্ছে মানবেতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক কাব্য সংকলন। ৪০ হাজার পঙ্‌ক্তিমালায় বিন্যস্ত তাঁর দেওয়ানে শাম্‌স তাবরিজি; প্রেমগীত হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে যার তুলনা এটি নিজেই। এর বাইরে তিনি ৩৫ হাজার পারসিক শ্নোক এবং দুই হাজার রুবাইয়াত রচনা করেছেন। তাঁর সমগ্র রচনার মূল সুর হচ্ছে প্রেম। সৃষ্টিকে ভালোবেসে স্রষ্টার ভালোবাসায় উন্নীত হওয়ার সিঁড়ি হচ্ছে তাঁর এই প্রেম। সে জন্য তাঁকে বলা হয় দ্য মেসেঞ্জার অব লাভ- প্রেমের বার্তাবাহক।
রুমি তাঁর মানবপ্রেম, সহিষুষ্ণতা, সমঝোতা ও দয়ার দর্শনের কারণে ৮০০ বছর পর আজও জীবন্ত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতি ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব ও অসহিষুষ্ণতা সৃষ্টির যেসব ঘটনা ঘটছে, সেসবের অবসান এবং বিশ্বে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় রুমির শিক্ষা অনুযায়ী তাঁর বিশ্বদর্শনকে কাজে লাগাতে হবে। সেটি হচ্ছে রুমির প্রেমদর্শন। সর্বজনীন প্রেম, বিশ্বজনীন ভালোবাসা। সেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ, গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই মানুষ। বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই।
এখানে উল্লেখ করা যায়, বিশ্বপ্রেমিক রুমির জানাজার সময় মুসলমানদের সঙ্গে বহু খ্রিষ্টান, ইহুদি ও অগ্নি উপাসক উপস্থিত ছিলেন। কেননা, তাঁরা সবাই তাঁকে বন্ধু ও আপনজন মনে করতেন। এটিই হচ্ছে রুমির সর্বজনীন প্রেমের অমোঘ নিদর্শন। রুমির সেই সর্বজনীন প্রেমের সাধনা যে রহস্যময়তার ঘোর তৈরি করেছে; তাঁর কবিতার সেই ঘোরে ৮১৫ বছর পরে আজকের আধুনিক মানুষও মোহাচ্ছন্ন। তাই একটি শান্তিময় সমাজ আর স্বস্তিময় নিরাপদ আবাস গড়তে রুমির প্রাসঙ্গিকতা আজ অনেক বেশি। বিশেষ করে বর্তমানে ধর্মের নামে যে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ চলছে; নিরপরাধ মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে বেহেশতে যাওয়া এবং সেখানকার হুর পাওয়ার নিষ্ফম্ফল বাসনায় একটি বিপথগামী-বিভ্রান্ত গোষ্ঠী যে পৈশাচিকতা চালাচ্ছে; তা থেকে উত্তরণেও আজ রুমির জীবনদর্শন অনুসরণ প্রয়োজন।
আমরা সেই বিশ্বপ্রেমিক রুমিকে নিয়ে কথা বলছি। শুধু আমরা কেন, গোটা পৃথিবী আজ রুমিকে নিয়ে মাতোয়ারা। মসজিদের মিম্বর, মাদ্রাসার চৌহদ্দি, খানকার মিলন আর ধর্মীয় মাহফিলের বয়ান থেকে শুরু করে সুদূর আমেরিকার ভুবনবিখ্যাত সংগীতশিল্পী ম্যাডোনা পর্যন্ত রুমিতে মশগুল। ইউরোপ-আমেরিকায় আজ রুমি অবশ্যপাঠ্য। আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে রুমি আজ এক অপার বিস্ময়! কয়েক দশক ধরে খোদ বস্তুবাদী আমেরিকায় শান্তি রুমি বেস্ট সেলার; সর্বোচ্চ জনপ্রিয় কবি ও দার্শনিক। কি প্রাচ্য, কি প্রতীচ্য- সবখানেই আজ রুমি প্রাসঙ্গিক। রুমি তাদের আপনজন, তাদের জীবন-সংসার আর একাডেমিক ডিসকোর্সের অবধারিত ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কেন রুমির এই উপযোগিতা আর কেনই-বা তাঁর এত গ্রহণযোগ্যতা? এক কথায় যদি বলি, তাহলে সেটি রুমির শান্তি-দর্শন, প্রেম-দর্শন। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই মহান রব জানেন কীসের মাধ্যমে সৃষ্ট মানুষ পরিতৃপ্ত হবে; তাদের অন্তরাত্মা প্রশান্ত হবে। তাই তিনি সৃষ্টিকুলের মাঝে ভালোবাসা আর প্রেমের নেয়ামত দিয়ে জগৎকে বিমোহিত করলেন। মানুষকে শুধু ভালোবাসা আর প্রেমের সম্পদই দেননি, বরং আশরাফুল মাখলুকাতকে দিয়েছেন পরিশুদ্ধ বিবেক আর চিন্তা-গবেষণার মহান দৌলত। মহব্বত, ভালোবাসা ও প্রেম নানাভাবে রুমির জীবন, কর্ম ও কাব্য-সাহিত্য রচনায় বাগ্ধময় হয়ে উঠেছে; যা ধারণ করলে, মেনে চললে আমাদের সামগ্রিক জীবন ও সমাজ হয়ে উঠবে শান্তিময়, প্রেমময়।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন: চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়