গত ৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে চোখ রাখতেই সবার আগে একজন আত্মহত্যাকারীর ছোট্ট একটি সুইসাইড নোট আমার নজর কাড়ে। বরিশালের উদীচীর বাচিক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী নিপা আত্মহত্যা করেছেন। ২৫ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত এ নারী আত্মহত্যার আগে লিখে গেছেন- 'ব্যস্ত দুনিয়ার সবাই আবার ব্যস্ত হয়ে যাবে।' এটা খুবই স্বাভাবিক এবং চিরায়ত। তাঁর মৃত্যুরহস্য হয়তো দ্রুত উদ্ঘাটিত হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জন আত্মহত্যা করেন। বছরে প্রায় ১৫ হাজার। পৃথিবীতে বছরে ৯ লাখ এবং প্রতি সেকেন্ডে একজন। মানুষ নিজের জীবনকে নিজেই শেষ করে দিতে পারে। এটা কি ভাবা যায়! এটা কি এত সহজ কাজ? গবেষণা বলে, অন্যকে হত্যা করার চেয়ে অনেক অনেক গুণ দুঃসাহস লাগে নিজেকে হত্যা করতে এবং অতি মেধাবী ও সাহসীরাই আত্মহত্যা করতে পারে।
আত্মহত্যা বোধ করি, পৃথিবীর সমান বয়সী এক আদিম ব্যাধির নাম। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের সূচনা এবং বিপরীতক্রমে মানুষ তার নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখা একই সঙ্গে ঘটে। এটা ধ্রুব সত্য- মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এর সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। এটা জন্মগতভাবে প্রাপ্ত। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীও নিজেকে সর্বাগ্রে রক্ষা করার কলাকৌশল রপ্ত করতে শেখে। এটাও মানুষের মতো প্রকৃতিগতভাবেই প্রাপ্ত। কথায় বলে- নিজে বাঁচলে বাপের নাম। নিজের জীবনের প্রশ্নে মানুষ নাকি সবসময় অন্য প্রাণীর চেয়ে স্বার্থপর। কেউ মরতে চায় না। সুন্দর মায়াবী এ ভুবন ছেড়ে চলে যেতে চায় না। শেষ মুহূর্তের হূৎস্পন্দন পর্যন্ত আশায় বুক বেঁধে থাকে। এই তো আমি বেঁচে আছি। জীবন এত স্বপ্নময়, এত মধুর। এর মোহে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে সবাই। তবু প্রতিদিন বিস্ময়াহত হয়ে দেখি, পত্রিকার পাতাজুড়ে আত্মহত্যার সংবাদের ছড়াছড়ি। কী বিচিত্র, বীভৎস মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চলেছে মানুষ! প্রশ্ন জাগে- কেন আত্মহনন, কারা করে, কখন করে? একে কি প্রতিরোধ করা যায়? নাকি একেবারেই অবশ্যম্ভাবী এবং অপ্রতিরোধ্য পরিণতি?
আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট এবং ভাস্বর। তার আকস্মিক অকাল প্রয়াণে আমি মানসিকভাবে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। কারণ ঢাকার একটি অভিজাত হোটেল-কক্ষের ফ্যানের সঙ্গে তার ঝুলন্ত দেহখানা পুলিশের পরে সম্ভবত আমিই প্রথম দেখি।
মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ফরহাদকে প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ, সংশয়বাদী ও অস্থিরতায় পেয়ে বসেছিল। তাঁর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা, অযৌক্তিকতা। একদিন বিকেলে সে হন্তদন্ত হয়ে আমার টিকাটুলীর দুই কামরার ছোট্ট বাসায় এসে হাজির। কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলছিল, তাকে কারা যেন দীর্ঘদিন যাবৎ অনুসরণ করে আসছে। তাকে সারাক্ষণ গোয়েন্দা সংস্থাও ফলো করছে। তাকে কারা যেন মেরে ফেলতে চায়। অদৃশ্য আততায়ীর হাত থেকে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে সে পকেটে একটা পেপার ওয়েট রেখেছে। তার পকেটে পেপার ওয়েট বহন করার কাহিনি আমাদের আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীরও একবার আমাকে বলেছিল।
আমি বললাম, এসব কী বলছ? কল্পনাবিলাসিতা ছাড়ো। বসো, চা-নাশতা খাও। আমি তোমার সঙ্গে বের হচ্ছি। দেখি, কোথায় কারা তোমাকে ফলো করে। তখন সে আরও বিচলিত বোধ করত। ভাবছি, আমাকেও আবার সন্দেহ করা শুরু করে কিনা। আমারও চাকরিজীবনের শুরুর সময়। বৈষয়িক কোনো বোধ তখনও জাগ্রত হয়নি। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে দু'জন মতিঝিলের দিকে যাচ্ছি। দৈনিক জনকণ্ঠ অফিস ছিল সেখানে। এবার তার সাংবাদিকতার নেশা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগরের একজন অগ্রজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। হঠাৎ নিঃসংকোচে এবং বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলে ফেলল, 'আত্মহত্যা করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল জায়গাটা খুব সুন্দর হবে- কী বলিস! সকাল বেলায় এসে ছেলেমেয়েরা দেখবে তরতাজা উপুড় হয়ে পড়ে আছি আমি। বেশ মজাই হবে, তাই না?'
আমি হতভম্ব। কী এসব বলছ তুমি? সে বলে, না; এমনি বলছি। তুমি তো পত্রিকার চাকরির জন্য যাচ্ছ। পাগলামি করো না, প্লিজ। তুমি চাইলে অনেক কিছু করতে পারবে ইত্যাদি। এবার সে বলল ... শোন, 'একদিন ভরা জোছনারাতে আমি ওখানটায় গিয়েছিলাম। দেখি ধবধবে ফরসা আলো ছড়িয়ে আছে কার্জন হলের মূল ফটকের চারপাশে। মধ্যরাতেও গাছের ছায়া দেখা যাচ্ছিল। চাঁদের আলো আর বিদ্যুতের আলোয় একাকার সবকিছু। রাতটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু বাদ সাধে দু'জন কর্তব্যপরায়ণ নৈশপ্রহরী। বারবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করছিল, এত রাতে এখানে কী করছেন; পরিচয় কী- এসব। আমি নিরুত্তর থেকে একটু অপেক্ষা করে ফিরে আসি। সেদিন সময়টা মোটেই অনুকূলে ছিল না।'
তার এমন দুঃসাহসিক অকপট বর্ণনা শুনে আমি খানিকটা ঘাবড়ে যাই। যদিও তাকে বুঝতে দিইনি। ভেতরে ভেতরে ভয় হচ্ছিল। আবার ভাবছিলাম, সে তো সবসময় এভাবেই বলে। একটা কাজে ডুবে গেলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
কী আশ্চর্য! জানা যায়, ১৯৬১ সালে মাত্র ৬২ বছর বয়সে আত্মহত্যার আগে নোবেলজয়ী ও আমেরিকান বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে একই আচরণ করতেন। আর ১৯৬১ সালেই জন্ম নেওয়া আমাদের মেধাবী বন্ধু, চৌকস ও বাগ্মী ফরহাদ প্রিতম হোটেলের চারতলার এক নির্জন কক্ষে বৈদ্যুতিক পাখার সঙ্গে কণ্ঠ বেঁধে মাত্র ৩৫ বছরের জীবনকে বলে দিল- 'না'। তবে তার কোনো সুইসাইড নোট ছিল না। ঝুলে থাকা শরীরের নিচে বিছানায় একটা উন্মুক্ত বলপেন আর সাদা প্যাড পড়ে ছিল। তাতে কালির আঁচড় লাগেনি।
হোসেন আবদুল মান্নান: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক