ইরানে এই মুহূর্তে যা চলছে, তা কি রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতি কিংবা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন? এটা ঠিক, রাজধানী তেহরানসহ দেশটির ৮০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় স্থাপনাতে আগুন দিচ্ছে মানুষ। হামলা করছে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। বিক্ষোভ দমনে মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশটির ধর্মীয় সরকার। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ চালাচ্ছে গুলি। সহিংসতায় এ পর্যন্ত মারা গেছে ৮০ জনের বেশি মানুষ। বিক্ষুব্ধ সহস্রাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু
শুরুটা গত ১৬ সেপ্টেম্বর। তেহরান পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, পোশাক পরার রাষ্ট্রীয় বিধান না মানায় আটক এক নারী তাদের হেফাজতে মারা গেছে। তাঁর বয়স ২২ বছর। নাম মাহসা আমিনি। দেশটির সংবাদমাধ্যম বলছে, মাহসার বাড়ি উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ কুর্দিস্তানে। বাবা-মা আর ভাইবোনদের নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন তেহরানে; ১৩ সেপ্টেম্বর। বসে ছিলেন স্থানীয় একটি পার্কে। তাঁদের পরনের পোশাক রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া বিধানমতোই ছিল। গোল বাধল তখনই, যখন ইরানের 'নৈতিক পুলিশ' দেখল, মাহসার হিজাব গলিয়ে এক গোছা অদ্যম চুল তেহরানের বাতাসে উড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ মাহসাকে রাষ্ট্রের ভাষায় সঠিকভাবে পোশাক না পরার অপরাধে আটক করে। এ সময় সঙ্গে থাকা ভাই তাঁর বোনকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তবে তাঁকে পুলিশ ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। এক প্রকার ধস্তাধস্তি করেই মাহসাকে পুলিশ ভ্যানে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ হেফাজতেই মারা যান মাহসা।
রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার
জাতিসংঘে ইরানের মানবাধিকারবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নাদা আল-নাশিফ বলেছেন- তাঁরা যেটা জানতে পেরেছেন, তার সঙ্গে পুলিশের দাবির কোনো মিল নেই। মাহসা 'হৃদরোগে' মারা গেছেন বলে পুলিশ দাবি করলেও নৈতিক পুলিশ মাহসা আমিনির মাথায় লাঠি দিয়ে মেরেছে এবং তাদের (পুলিশ) একটি গাড়ির সঙ্গে মাহসার মাথা সজোরে ঠুকেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও মাহসার মৃত্যুর যে ছবি সম্প্র্রচার করা হয়েছে, তাতেও দেখা যাচ্ছে, একটি চেয়ারের ওপরে বসে থাকা মাহসা মেঝেতে পড়ে যাচ্ছেন। তবে মাহসার পরিবার মানতে চাইছে না এসব। তাদের দাবি, মাহসাকে পুলিশ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এর পরই ফুঁসে উঠতে শুরু করে ইরান। নারীরা তাদের চুল কেটে ফেলছে। শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক; এমনকি ক্রীড়াবিদরাও সোচ্চার সামাজিক গণমাধ্যমে। বিক্ষুব্ধ মানুষ রাজধানী তেহরান ও অন্য বেশ কয়েকটি শহরে যানবাহনে আগুন দিয়েছে। পুড়িয়ে দিয়েছে থানা। হামলা হচ্ছে দমনের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরেও।
সরকারের অনড় অবস্থান
এবারের বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের কথিত ইসলামী বিপ্লবের পর বিশেষ করে নারীদের ওপর আরোপিত ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে একটি জনচ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ এই অনুশাসন মানতে বাধ্য করতে গঠিত 'নৈতিক পুলিশ'-এর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। নারীদের পোশাক, চলাফেরার মতো অনেক ইস্যুতে ইতোমধ্যে বিশেষ এই বাহিনী বেশ অজনপ্রিয় উঠেছে। এদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো বিক্ষোভও হয়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে। তবে এবারের বিক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিয়েছে সরকার-সংশ্নিষ্টরা। নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে যেন কোনোভাবেই তাদের ধর্মীয় রাষ্ট্রটি হুমকিতে না পড়ে।
বিশ্ববাসীর কাছ থেকে বিক্ষোভের সঠিক চিত্র আড়াল করতে বরাবরের মতো প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সেবা। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বেসরকারি সংবাদমাধ্যম। আটক করা হচ্ছে সংবাদকর্মীদের। সরকারের ক্ষমতার সব অনুষঙ্গকে কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বড় বড় শহরে সরকারি আয়োজনে রাষ্ট্রীয় বিধানমতো পোশাকে সজ্জিত নারীদের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এমনটা জানাতে- দেশের বেশিরভাগ নারী মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় বিধান মেনে স্বাচ্ছন্দ্যেই আছে। যারা বিরোধিতা করছে, তাদের সংখ্যা সামান্যই।
বিক্ষোভ বাড়ছে
মানুষ বাড়ছে রাজপথে। নারীর স্বাধীনতা আর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ও পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন ইস্যু হলেও তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিস্তৃত দুর্নীতি, সামাজিক বিধিনিষেধ আর শাসকগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরোপিত বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞাসৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধাচরণের মতো বিষয়। দাবি উঠছে যৌক্তিকভাবে বেঁচে থাকার বিষয়টি, যা অনেক বছর ধরেই চলছে যারপরনাই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে- জনবিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে পুরো দেশ। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এবারের বিক্ষোভ থেকে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা ২০১৯ সালে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে হওয়া পরিস্থিতির মতো হয়ে উঠতে পারে। ওই বিক্ষোভ-সহিংসতায় অন্তত হাজার দেড়েক মানুষ নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত ইরান সরকার নমনীয় হয়নি।
বিরোধী রাজনীতির অভাব
ইরানে বৈধ ও সংগঠিত বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতার অস্তিত্ব নেই। জনগণ মাঝেমধ্যেই নিজেদের মতো করে ধর্মীয় নেতৃত্বের নানা বিধি-বিধান ও জনবিরুদ্ধ উদ্যোগের বিরোধিতা করে। কিন্তু তার খুব কমই দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম ও জোরালো নিয়ন্ত্রণের অর্গল গলিয়ে বিশ্বের কাছে পৌঁছে। দেশটিতে যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা সবাই মুখ্যত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো ও নীতি-নৈতিকতাকেই সমর্থন করেন। তবে এই রাজনৈতিক তৎপরতা আবার মোটা দাগে তিন ভাগে চর্চিত হয়। এক. দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সর্বাত্মক রক্ষণশীল। দুই. সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি কিংবা আলি লারিজানির নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি বা বাস্তবপন্থি রক্ষণশীল। তিন. আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি সমর্থিত সংস্কারবাদী। এরা মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে দেশটিকে উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। তবে ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে সংস্কারবাদীদের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে।
আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতি
ইরানে এখন পর্যন্ত যা ঘটছে তাকে কোনোভাবেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল কিংবা শাসন-শোষণ পদ্ধতি বদলের আন্দোলন বলা যাচ্ছে না। বরং একে ইস্যুভিত্তিক বলাই শ্রেয়। এমন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন আমরা নিকট অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশেই প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। সর্বক্ষেত্রেই দেখছি, শেষ পর্যন্ত উপরিকাঠামোগত কিছুটা রদবদল হচ্ছে। শাসকশ্রেণির নানা চাতুরী আর সময়ক্ষেপণে মানুষ সেই তিমিরেই থাকছে। কিছুই পাল্টাচ্ছে না। ইরানেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে বলে মনে হয় না।
সেলিম খান: সাংবাদিক