বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। এসব নির্যাতনের মধ্যে যৌন নিপীড়নও যে আছে, তা ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে সামনে এসেছে। এখন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দায়ীদের শাস্তির পাশাপাশি তা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইডেন কলেজের একজন শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কতিপয় নেত্রী দেহব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ কাজে বাধ্য করেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিস্কার হওয়াদের মধ্যে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীও রয়েছেন। অবশ্য বহিস্কারের পর সুর পাল্টে তিনি বলছেন, তাঁর বক্তব্য সংবাদমাধ্যম সঠিকভাবে প্রচার করেনি। তিনি অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে দেহব্যবসার বিষয়টি শুনেছেন। সংবাদমাধ্যমের ওপর দায় না চাপিয়ে নিজের দায়িত্ববোধ বাড়ানো উচিত। শোনা কথা যাচাই না করে ঢালাওভাবে সংবাদমাধ্যমে বলতে হবে কেন?
ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতির কারণেই এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে; কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য হামলা-পাল্টা হামলা, সংবাদ সম্মেলন-পাল্টা সম্মেলন করছে। দেহব্যবসার অভিযোগটিও হয়তো সেই কাদা ছোড়াছুড়ির অংশ। কিন্তু পদ-পদবি, আধিপত্য নিয়ে বিরোধে এভাবে সংঘাতে জড়ালে সেটা প্রতিষ্ঠানের যেমন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণম্ন করে; একইভাবে ব্যক্তিগত জীবনেও কালিমা ডেকে আনে। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে ইডেন কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি অংশ দেহব্যবসার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে, এসব কুৎসিত বক্তব্যের কারণে তাদের বিয়ে ও চাকরি নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে।
ছাত্র রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও রয়েছে এর গৌরবময় ভূমিকা। '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও '৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। একটি যৌক্তিক আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণ করে। আর এসব মানুষকে সংগঠিত করে ছাত্র সংগঠন।
আদর্শিক কারণে ছাত্র রাজনীতিতে কেউ ছাত্রলীগ, কেউ ছাত্রদল, কেউ ছাত্রসমাজ কিংবা বাম ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি করতে পারে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যদি সেই রাজনীতি হয়, তাহলে কে কোন দলের অনুসারী, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি যখন হয়ে যায় ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক, তখন ইডেন কলেজের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘাত-সংঘর্ষ হচ্ছে না। এখানে নিজ সংগঠনের দুই গোষ্ঠী ও দুই ব্যক্তির অনুসারীর মধ্যে সহিংসতা হচ্ছে। আদর্শ ও নৈতিকতার পতনের কারণে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে উঠছে।


এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না- ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর যে অডিও ভাইরাল হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কীভাবে তিনি সিট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। রিভা সেই অডিওতে থাকা বক্তব্য অস্বীকার করেননি; তবে ক্ষমা চেয়েছেন। তখনই কলেজ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ রিভার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারত।
শিক্ষার্থীর পায়ে গরম চা ঢেলে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ইডেন কলেজের ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান আমলে বাঙালির ওপর নানাভাবে নির্যাতন হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বর্বরতা কীসের আলামত? মনে রাখতে হবে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা আনতে হয়েছে। এ জন্য ৩০ লাখ শহীদ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। ২ লাখ মা-বোনকে নির্যাতিত হতে হয়েছে।
দুই লাখ মা-বোনকে ইজ্জত হারাতে হয়েছে- কথাটা এভাবে অবশ্য বলতে চাই না। কারণ, যারা নিরীহ মা-বোনদের ওপর অত্যাচার করেছে, মূলত তাঁরাই ইজ্জত হারিয়েছেন। আমাদের মা-বোন যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন তাঁরা বীর যোদ্ধা।
কথা হচ্ছে- এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চার সেল থাকবে কেন? মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। তাই বলে কি রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করতে হবে? ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তাঁদের রুমে ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখা হয়। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এটা কোন ধরনের বর্বরতা? বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার জন্য কত আন্দোলন করেছেন! আমাদের নারীরাও পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কতিপয় নেত্রীর ব্যক্তিস্বার্থে দেশের বড় একটি নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমালোচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ন্যক্কারজনক ঘটনার দায় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ প্রশাসন এড়াতে পারে না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের তাণ্ডব প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার বলেছেন, ১৮ জন ছাত্রলীগ নেতার কাছে ২৮ হাজার শিক্ষার্থী জিম্মি। ইডেন কলেজের ঘটনার পরও অধ্যক্ষ এবং হল সুপারদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এসব করে তো প্রশাসন অন্যায়কারীদের পক্ষই অবলম্বন করছে। বিশেষ করে ইডেন কলেজের ঘটনার পর কলেজ প্রশাসনের আরও বাস্তবমুখী ভূমিকা রাখা দরকার ছিল।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। পুরুষের দ্বারা নারী নির্যাতনের অনেক উদাহরণ আছে। কিন্তু নারীর দ্বারা নারী নির্যাতনের ঘটনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত হয়ে থাকবে।
ছাত্র রাজনীতি মানুষের মধ্যে আবেগ সৃষ্টি করে। কিন্তু এসব নোংরামির চর্চা আবেগের বদলে ঘৃণার উদ্রেক করে। এটা দুঃখজনক। আমরা এ ধরনের রাজনীতি চাই না। রাজনীতিতে জনগণের কাছে জবাবদিহি না থাকায় আদর্শিক চর্চার বদলে ব্যক্তি ও গ্রুপিংয়ের চর্চা বাড়ছে। মনে রাখতে হবে- স্বাধীনতা অর্জন করলেই হবে না; এটা ধরে রাখতে হয়। যাঁরা পদ পেয়েছেন তাঁদের সংযমী হতে হয়। ভিন্নমতের হলেই নির্যাতনের স্টিম রোলার চালালে পতন অনিবার্য হয়ে আসে।
নারী-পুরুষ, আদিবাসী-বাঙালি সবার জন্য এই দেশ। রাজনৈতিক দলের যাঁরা দায়িত্বে আছেন, বিশেষ করে যাঁরা ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বে; তাঁদের কঠোর হওয়া উচিত। যাঁরা নিজেদের স্বার্থে দেশবাসীর কাছে প্রতিষ্ঠান ও নারীকে তুচ্ছ করছেন; তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে এ চর্চা বাড়তেই থাকবে। বুয়েটে আবরারের রক্ত ঝরেছে। তার পরও আমরা সচেতন হইনি।
ইডেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিচার চাইতে আদালতে গেছেন। আদালত লালবাগ থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ যেহেতু এসেছে, সেহেতু এর ভূত খুঁজে বের করতে হবে। নির্যাতন ও সিট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কলেজ প্রশাসনের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে।
আগে-পরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রদবদল ঘটেছে। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে কতজনকে সরাবেন? এসব উপাচার্য, অধ্যক্ষকে জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে পড়ার উদ্দেশ্য আলোকিত মানুষ হওয়া। সেখানে নারী হয়ে আরেক নারীকে দাবিয়ে রাখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। এ ধরনের নোংরামির পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদেরও শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। বন্ধ করতে হবে লেজুড়বৃত্তি।
খুশী কবির: সমন্বয়ক, নিজেরা করি